আজ ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে আজ সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা ভিড় করেছেন টঙ্গীর তুরাগ তীরে। অনেকে এখনো রাস্তায় রয়েছেন। আজ সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে শুরু হয়ে জোহরের আগেই ইজতেমার এবারের পর্বের আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
আজ সকাল থেকেই আখেরি মোনাজাতে অংশ নেওয়ার জন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসল্লিরা ভিড় জমিয়েছেন। এতে ইজতেমা ময়দান সংলগ্ন সড়কগুলোতে সকাল থেকেই যানজট দেখা যাচ্ছে।
রবিবার জোহরের আগেই মোনাজাত অনুষ্ঠিত ও শেষ হবে বলে জানিয়েছে বিশ্ব ইজতেমা মুরুব্বিরা।
মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী ঘোড়াশাল ও কামারপাড়া সড়ক। এছাড়া আশপাশের অন্য সব সড়কেই বাড়তি যানবাহন দেখা যাচ্ছে।
এবার বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব পরিচালনা করেন মাওলানা জোবায়ের অনুসারিরা। দ্বিতীয় পর্ব পরিচালনা করবেন সাদ অনুসারিরা।
শীত ও নানা ভোগান্তি উপেক্ষা করে টঙ্গীর তুরাগ তীরে ইজতেমা ময়দানমুখী মুসল্লিদের স্রোত দেখা যাচ্ছে। যানবাহন না পেয়ে অনেকেই পায়ে হেটে অংশ নিতে তুরাগ তীরে রওনা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা’র আম বয়ানের মধ্যে দিয়ে ইজতেমার প্রথম পর্বের শুরু হয়। শুক্রবার বাদ ফজর আম বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা ওবায়দুল্লাহ খুরশিদ। পরে তা বাংলায় বয়ান তরজমা করেন বাংলাদেশি মাওলানা আব্দুল মতিন।
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionহুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়ছে সৌদি সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনি বাহিনী
হুথি বিদ্রোহীরা দাবি করছে এই হামলা তারা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি এর পেছনে আছে ইরান। আর ইরান এর সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্কের কথা জোর গলায় অস্বীকার করছে।
সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনার ওপর নাটকীয় হামলার পর তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সৌদি আরবের এই তেলস্থাপনাগুলো গোটা বিশ্বের তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে খু্বই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো যে কতটা নাজুক অবস্থায় আছে, এই হামলা সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যে বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি আরব, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের মদত আছে। সৌদি আরবের এসব বিমান সরবরাহ করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। বহু দিন ধরে সৌদি আরব হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু প্রতিপক্ষও যে পাল্টা হামলার ক্ষমতা রাখে, সৌদি তেল স্থাপনার ওপর এই আঘাত তারই প্রমাণ।
তবে এই ঘটনা সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার উস্কে দিয়েছে- হুথি বিদ্রোহীদের ইরান কী পরিমাণ সামরিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে? মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এমনিতেই অস্থিতিশীল। সেখানে এই সর্বশেষ ঘটনা যেন পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।
কিন্তু এই হামলা একই সঙ্গে ইরানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি এবং কৌশলের ব্যর্থতাও ফুটিয়ে তুলেছে।
সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার ব্যাপারে নানা দাবি এবং পাল্টা দাবির মধ্যে অনেক তথ্য এখনো অজানা।
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionহামলার পর জ্বলছে সৌদি তেল স্থাপনা
হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিভিন্ন টার্গেটে আগেও ড্রোন এবং মিসাইল হামলা চালিয়েছে। কিন্তু ড্রোন হামলা থেকে তারা খুব সীমিত সাফল্যই পেয়েছে।
তবে এবারের যে হামলা সেটা এমন মাত্রার যে তার সঙ্গে আগেরগুলোর কোন তুলনাই চলে না। বহুদূর থেকে যেরকম ব্যাপক মাত্রায় যে ধরণের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা হয়েছে, তার নজির নেই।
মিসাইল না ড্রোন
এই হামলার ব্যাপারে আরেকটি প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত। হামলায় কি 'আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল' (ইউএভি) ব্যবহার করা হয়েছে, নাকি নতুন কোন ধরণের মিসাইল। যদি মিসাইল ব্যবহার করা হয়ে থাকে, সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন তার সংকেত পেল না?
আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে হামলার পেছনে ইরাকের কোন ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠী ছিল, নাকি স্বয়ং ইরানই জড়িত?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও কিন্তু কোন সময় নষ্ট না করে সরাসরি তেহরানের দিকে আঙ্গুল তুলছেন এই ঘটনার জন্য। ঘটনার ব্যাপারে কোন গোয়েন্দা তথ্যের জন্য পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করেননি।
কয়েকঘন্টা পর অবশ্য মার্কিন সূত্রগুলো দাবি করতে থাকে মোট ১৭টি স্থানে এই ড্রোন হামলা হয় এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসব হামলা হয়েছে উত্তর বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে। যুক্তরাষ্ট্র বলতে চাইছে এই হামলা হয়েছে ইরান বা ইরাকের দিক থেকে, দক্ষিণের ইয়েমেন থেকে নয়।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা এই হামলা ব্যাপারে আরও বিস্তারিত তথ্য জানাবে। হামলায় ব্যবহৃত যেসব ড্রোন টার্গেট পর্যন্ত যেতে পারেনি, সেগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে।
Image captionযেসব সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা হয়েছে
কোন দিক থেকে হামলা
২০০৮ সালে জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞ প্যানেল বলেছিল, হুথি বিদ্রোহীদের কাসেফ-ওয়ান ড্রোনের সঙ্গে ইরানের আবাবিল-টি ড্রোনের ব্যাপক সাদৃশ্য আছে। জাতিসংঘের দলটি তাদের রিপোর্টে বলেছিল, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি আছে, ইরান সেটি ভঙ্গ করেছে এবং হুথি বিদ্রোহীদের নানা রকম অস্ত্র সরবরাহ করেছে।
কাসেফ-ওয়ান কিংবা আবাবিল-টি ড্রোন বড়জোর ১০০ বা ১৫০ কিলোমিটার দূরত্বে যেতে পারে। ইয়েমেনের সীমান্ত থেকে খুরাইস তেল ক্ষেত্রের দূরত্ব প্রায় ৭৭০ কিলোমিটার। যেসব টার্গেটে হামলা হয়েছে, তার মধ্যে এই তেলক্ষেত্রই ইয়েমেনের সবচেয়ে কাছে।
ছবির কপিরাইটNURPHOTOImage captionইরানি সামরিক সরঞ্জাম কতটা পাচ্ছে হুথি বিদ্রোহীরা
কাজেই ইয়েমেনের দিক থেকে যদি এই হামলা হয়ে থাকে, তাহলে এবারের ড্রোনগুলো নিশ্চিতভাবেই একেবারে ভিন্ন ডিজাইনের, যেগুলো অনেক বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে এবং অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
ইরান এবং সম্ভবত হুথি বিদ্রোহীদেরও হয়তো আরও দূরপাল্লার ড্রোন আছে। কিন্তু এপর্যন্ত ইয়েমেনের যুদ্ধে সেধরণের ড্রোনের ব্যবহার দেখা যায়নি।
আরেকটা জল্পনা হচ্ছে, হামলায় হয়তো ক্রুজ মিসাইলও ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। হয়তো ইরাক বা ইরান থেকে এই ক্ষেপনাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে। কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের দরকার হবে।
সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি কতটা
কিন্তু শেষ বিচারে এসব খুঁটি-নাটি তথ্যের কোন মানে দাঁড়ায় না। কারণ কূটনৈতিক ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব ইরানের নির্মম শত্রু। ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে মনস্থির করে ফেলেছে। পারস্য উপসাগরে বিভিন্ন জাহাজে হামলার জন্য তারা ইরানকেই দোষী করছে।
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionসৌদি বিমান হামলার বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসে অসন্তোষ বাড়ছে
ইরান তাদের একটি তেলবাহী জাহাজ জিব্রালটারে আটক হওয়ার পর পাল্টা একটি ব্রিটিশ জাহাজ জব্দ করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, সৌদি আরবের তেল স্থাপনার বিরুদ্ধে হুথি বিদ্রোহীদের যত হামলা, তার সবকটিতে ইরানের হাতের ছাপ স্পষ্ট।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ ব্যাপারে তারা কী করবে বা কী করার ক্ষমতা রাখে?
এর উত্তর হচ্ছে, সম্ভবত খুব বেশি কিছু করার ক্ষমতা নেই।
ইয়েমেনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এমনিতেই শক্তভাবে সৌদি আরবের পক্ষে। কিন্তু এই যুদ্ধের ব্যাপারে মার্কিন কংগ্রেসে অতটা উৎসাহ নেই। কংগ্রেসে এমন মত প্রবল হচ্ছে যে, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে এই সৌদি বিমান হামলার কোন মানে নেই। একটা গরীব দেশের ওপর এই হামলা এক বড় মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যদিও সৌদি আরবের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন জোগাচ্ছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কথা বলছে, বাস্তবে তেহরানের কাছে তারা কিন্তু নানা ধরণের বার্তা দিচ্ছে।
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionপ্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি যুদ্ধের ঝুঁকি নেবেন?
একদিকে মনে হচ্ছে মি. ট্রাম্প যেন ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটা মুখোমুখি বৈঠকে বসতে চান। তিনি মাত্রই তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে বরখাস্ত করেছেন। জন বোল্টন হচ্ছেন সেরকম একজন কট্টরপন্থী, যিনি কিনা যে কোন পন্থায় ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতায় পালাবদলের পক্ষে।
ইরান এবং হুথি বিদ্রোহীরা যুদ্ধে যে ধরণের কৌশল নিয়েছে, সেটা শক্তিমানের বিরুদ্ধে দুর্বলের লড়াইয়ের চিরাচরিত কৌশল। বেশিরভাগ কৌশল যেন রুশদের কাছ থেকে ধার করা- যে কোন কিছু অস্বীকার করা, ছায়াযুদ্ধ, সাইবার হামলা এবং প্রপাগান্ডা যুদ্ধ।
তেহরান ভালো করেই জানে, মিস্টার ট্রাম্প মুখে যত কথাই বলুন, আসলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোন যুদ্ধে জড়াতে চান না, বরং যুদ্ধ থেকে বের করে আনতে চান। এর ফলে ইরানই বরং এখন পাল্টা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে।
কিন্তু যে কোন মূহুর্তে যে কারও একটা ভূল হিসেবের কারণে একটা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার আশংকা আছে, যেটা আসলে কেউই চায় না।
Image caption২০১৭ সালের ২৫শে অগাস্ট একদিনেই বাংলাদেশে চলে এসেছিল লাখখানেক রোহিঙ্গা।
ধরা যাক, মেয়েটির নাম নুর বেগম।
১৯৯২ সালে পরিবারের সঙ্গে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল মেয়েটি। এরপর রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই তার বড় হয়ে ওঠা।
পড়াশোনায় ভালো এই মেয়েটি প্রথমে ক্যাম্পের স্কুলে, পড়ে কক্সবাজারের স্থানীয় একটি স্কুলে পড়াশোনা করে। সেই সঙ্গে কিছু সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এ সময় তার রোহিঙ্গা পরিচয় শুধু ঘনিষ্ঠ কয়েকজনই জানতো।
স্কুল-কলেজের লেখাপড়া শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হওয়ার পর একদিন জানা যায়, মেয়েটি রোহিঙ্গা। আর সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের স্কুল কলেজে পড়াশোনা করতে না দেয়ারও একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পর মেয়েটিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের আসল মর্যাদা কি? তারা কি শরণার্থী, নাকি শুধুই আশ্রয়প্রত্যাশী? তাদের অধিকার আসলে কতটা আছে?
Image captionপলিথিনে ছাওয়া একেবারে ছোট আকারের কুঁড়েঘরেই মাথা গুঁজতে হয় কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে।
শরণার্থী মর্যাদা
শরণার্থীদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯৫১ সালে জাতিসংঘ একটি কনভেনশন গ্রহণ করে, যা ১৯৬৭ সালের প্রটোকল হিসাবে সংশোধিত হয়।
কিন্তু বাংলাদেশ ওই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।
ফলে বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের জন্য যেসব অধিকার বা সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়, সেগুলো করার জন্য বাংলাদেশের সরকারের ওপর বাধ্যবাধকতা নেই।তবে ওই কনভেনশনে স্বাক্ষর না করলেও বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ - এবং সে কারণে দেশটি আশ্রয় প্রত্যাশীদের অনেকগুলো অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য, বলছেন শরণার্থী ও অভিবাসী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর।
''শরণার্থী কনভেনশনে একটা আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব থাকে, সেখানে সরকারের বেশ কিছু অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্যবাধকতা থাকে। কেউ আশ্রয়প্রার্থী হলে পুরোপুরি শরণার্থী বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তার দায়িত্ব নিতেও সরকার বাধ্য থাকে। কিন্তু শরণার্থী মর্যাদা দেয়া না হলে সরকার এসব দায়িত্ব পালন এড়িয়ে যেতে পারে'' - তিনি বলছেন।
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionবাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।
বাংলাদেশে এক্ষেত্রে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুসারে। বাংলাদেশে শরণার্থীদের ব্যাপারে কোন আইন নেই।
শরণার্থীদের ব্যাপারে নির্দিষ্ট আইন ও বিধিবিধান জারির আবেদন জানিয়ে ২০১৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসে হাইকোর্টে নিদের্শনা চেয়ে রিট পিটিশন করেছিলেন একজন আইনজীবী। তবে সেই রিটের এখনো রায় হয়নি।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিহারী জনগোষ্ঠী আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঘটনা ছাড়া বাংলাদেশে শরণার্থী হিসাবে আবেদনের খুব একটা নজীর নেই।
জাতিসংঘের সহায়তায় একসময় আটকে পড়া পাকিস্তানীদের ক্ষেত্রে শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়।
রোহিঙ্গারা কী শরণার্থী?
তবে সনদে স্বাক্ষর না করলেও ১৯৯২ সালে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছিলেন, প্রথম দফার তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। এই কার্যক্রমে সহায়তা করে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। এদেরকে কক্সবাজারের দু'টি ক্যাম্পে রাখা হয়।
তবে এর কিছুদিন পরেই আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন - কিন্তু তাদেরকে আর শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়নি।
সরকারি দু'টি ক্যাম্পের বাইরে আশেপাশে ঘর বানিয়ে তারা বসবাস করতে শুরু করেন।
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionবিশ্লেষকরা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর সরাসরি চাপ না দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা উচিত।
২০১৭ সালের অগাস্টের পর যে প্রায় আট লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তাদেরকে 'বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক' বলে বর্ণনা করছে সরকার। তাদের শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়নি।
তবে গণমাধ্যম ও দেশি বিদেশি বেসরকারি সংস্থাগুলো এদের শরণার্থী বলেই বর্ণনা করে থাকে।
এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানকে সমর্থনকারী যে বিহারি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের একসময় 'শরণার্থী' হিসাবে বিবেচনা করা হলেও, পরবর্তীতে তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে।
শরণার্থী মর্যাদা থাকা কতটা জরুরি
আসিফ মুনীর বলছেন, ''শরণার্থী মর্যাদার ব্যাপারটা আসলে একটা স্বীকৃতি দেয়া যে, তুমি তোমার দেশে বিপদে আছো, সেখানে যেতো পারছো না, তাই তোমাকে এখানে থাকতে দেয়া হলো। যখন আপনি কাউকে থাকতে দেবেন, তখন তো তার দরকারি চাহিদাগুলো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন ইত্যাদি সুবিধাও আপনাকে দিতে হবে।''
কিন্তু বাংলাদেশের সরকার চায় না যে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাক। এ কারণেই এই ইস্যুতে সরকার শরণার্থী মর্যাদা দিতে চায় না বলে তিনি মনে করেন।
''যে টার্ম সরকার ব্যবহার করছে, 'বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিক' - এটি ব্যবহারের ফলে তাদের ফেরত পাঠানোর একটি চাপ থাকবে। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও তাদের স্থায়ীভাবে থাকার পরিবেশ তৈরিতে আগ্রহী নয়।''
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionবাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় সোয়া দুই লাখের বেশি শিশু-কিশোর রয়েছে বলে বলছে জাতিসংঘ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধান কিন্তু বিদেশী নাগরিকদের দায়িত্ব নেয়ার কথা বলে না।
''আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই দশ লাখের বেশি মানুষকে আমরা দেশের মেইনস্ট্রিমে মিশিয়ে নিতে চাই কিনা, নাকি তাদের মিয়ানমারে, তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে চাই। এখন যদি তাদের এখানে পড়াশোনার সব ব্যবস্থা করে দেয়া হয়, নাগরিকদের মতো সব সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা আর নিজেদের দেশে ফেরত যেতে চাইবেন না।''
''কিন্তু সেই সঙ্গে তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারটিও নিশ্চিত করা দরকার। সেজন্য ক্যাম্পের ভেতরেই তাদের উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে'' - বলছেন লাইলুফার ইয়াসমিন।
শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলছেন, ''সমস্যা হলো, এই সংকট অনেক দিন ধরে চললেও আমাদের কোন দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল নেই। যেহেতু খুব তাড়াতাড়ি সবাইকে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, ক্যাম্পেও অনেক শিশুকিশোর বড় হচ্ছে। তাদের একেবারে অশিক্ষিত করে রাখাও ঠিক হবে না।''
তাই তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে এখনই একটি কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionবাংলাদেশে বর্তমানে এগারো লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে
শরণার্থী হলে কী সুবিধা পাওয়া যাবে?
আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলছেন, মালয়েশিয়ায় যে রোহিঙ্গারা শরণার্থী মর্যাদা পেয়েছেন, তাদের একটা কার্ড ইস্যু করা হয়। সেটি দেখিয়ে তারা সেখানে কাজ করতে পারেন, পড়াশোনা করতে পারেন, যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের তুলনায় কিছুটা পার্থক্য থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বিষয়টা তেমন নয়।
''বাংলাদেশের সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা সেখানকার স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে। এর বেশি পড়ার অনুমতি তাদের নেই। আবার ক্যাম্পের বাইরে চাকরি বা কাজের সুযোগ নেই। যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সবসময় পাস বা অনুমতির দরকার হয়।''
জেনেভা ক্যাম্পে যেসব আটকে পড়া পাকিস্তানি ছিলেন, তাদের জাতিসংঘের সহায়তায় অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দেয়া হতো। পরবর্তীতে অবশ্য তারা স্থানীয় চাকরি ও ব্যবসায় জড়িত হয়ে যান।
যে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে কয়েকশোজন তৃতীয় দেশে বসবাসের সুযোগ পান।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার মোঃ: মিজানুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''দুই ধরণের রোহিঙ্গা এখানে রয়েছেন। কিছু রোহিঙ্গার শরণার্থী মর্যাদা আছে, বাকিদের নেই। যদিও সবাই হয়তো তাদের শরণার্থী বলছেন, কিন্তু কনভেনশনের হিসাবে সবাই শরণার্থী নন। তবে সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সেটা আর আলাদা বলার সুযোগ নেই। ''
তিনি বলেন, ''শরণার্থী হিসাবে যে অধিকারগুলো পাওয়ার কথা, সেটা এখন সবাই সমানভাবে পাচ্ছেন। সুতরাং তাদের মধ্যে আমরা সুযোগ-সুবিধার খুব একটা পার্থক্য দেখতে পাই না।''
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionসরকারের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় সহায়তা কার্যক্রম চালাচ্ছে অনেক বেসরকারি সংস্থা
শরণার্থী থাকা-না-থাকার পার্থক্য
খাবার:
সরকার ও বেসরকারি সংস্থার তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের পরিবার প্রতি খাবার, পানি ও পারিবারিক দরকারি সব সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে শরণার্থী মর্যাদা থাকা-না-থাকার কোন পার্থক্য করা হয়না।
আবাসন:
শরণার্থী হিসাবে তালিকাভুক্ত ৩০ হাজার রোহিঙ্গা রেজিস্টার্ড দু'টি ক্যাম্পে বসবাস করেন। তবে এর বাইরে অসংখ্য ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছেন। এসব ক্যাম্পও সরকারিভাবে পরিচালনা করা হয়।
শিক্ষা:
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যে বিষয়গুলো জানা গেল, একটা সময়ে রোহিঙ্গারা স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করতে পারতেন। কিন্তু সম্প্রতি এক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার।
তবে স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের অনেক স্কুল-কলেজে রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে। তাদের অনেকে রোহিঙ্গা পরিচয় ব্যবহার করছেন, কিন্তু বেশিরভাগই মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে পড়াশোনা করছেন।
আরআরআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দু'টি রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়তে পারেন। অন্য ক্যাম্পগুলোয় প্রচলিত স্কুল না থাকলেও কিছু লার্নিং সেন্টার রয়েছে, যেগুলো বেসরকারি সংস্থাগুলো পরিচালনা করে। এর বাইরে কয়েকটি মাদ্রাসা রয়েছে।
সরকারের তরফ থেকে কিছুদিন আগে কক্সবাজারের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ক্যাম্পের বাইরের কোন স্কুলে যেন রোহিঙ্গা শিশু বা শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা না হয়। আগে যাদের ভর্তি করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রোহিঙ্গা ছাত্রীর এরকম পড়াশোনার খবর প্রকাশ হওয়ার পর তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ।
ছবির কপিরাইটREUTERSImage captionরোহিঙ্গা ক্যাম্পের জীবন
অন্য দেশে বসবাস:
শরণার্থী হিসাবে তালিকাভুক্ত কয়েকশো ব্যক্তিকে তৃতীয় কয়েকটি দেশ গ্রহণ করেছে। যদিও অনেক বছর ধরে সেই কার্যক্রম বন্ধ আছে।
বিয়ে:
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় প্রজ্ঞাপন জারি করে করে বলা হয় যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোন সদস্যকে বাংলাদেশি কেউ বিয়ে করতে পারবেন না। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর এরকম প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
বিশেষ করে কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির কাজী অফিসগুলোতে নির্দেশনা জারি করা হয়, যেন তারা এরকম বিয়ে না করান। এরকম বিয়ের কারণে বেশ কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়।
চিকিৎসা:
যদিও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ক্যাম্পের ভেতরেই সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে জরুরি ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আরআরআরসির কর্মকর্তা মিজানুর রহমান।
ছবির কপিরাইটGETTY IMAGESImage captionক্যাম্প থেকে পালাতে গিয়ে কক্সবাজারে আটক রোহিঙ্গাদের একাংশ
যাতায়াত:
শরণার্থী মর্যাদা থাকুক আর নাই থাকুক, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যেতে হলে পাস বা অনুমতি নেয়ার বিধান রয়েছে। তবে এই বিষয়টি এখনো খুব কড়াকড়িভাবে নজরদারি করা হয় না বলে কর্মকর্তারা বলছেন।
কাজের সুবিধা:
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে কাজ করার অনুমতি নেই। যদিও অনেকেই গোপনে এমনটা করছেন বলে জানা যায়।