আন্তর্জাতিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আন্তর্জাতিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার

কাশ্মীর সংকট: 'ভূস্বর্গ' থেকে 'মৃত্যু উপত্যকা' এবং নারীরা আবার হুমকির মুখে?

কাশ্মীর সংকট: 'ভূস্বর্গ' থেকে 'মৃত্যু উপত্যকা' এবং নারীরা আবার হুমকির মুখে?

বিশেষ ধারা বাতিলের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের বিক্ষোভ, শ্রী নগর, ৩১-০৮-২০১৯।ছবির কপিরাইটSOPA IMAGES
Image captionনারীদের প্রতিবাদ: বিশেষ ধারা বাতিলের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের বিক্ষোভ।
একথা সত্য যে স্বর্গের কোন ভাগাভাগি হয় না। যদিও তার দখলদারি নিয়ে দেবতা ও দানবদের মধ্যে লড়াই বেঁধেছে বারবার। এবং দেবতাদের কাছে বারম্বার পরাজিত হওয়ায় দানবদের স্বর্গবাসের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে গেছে।
তবে নাগালের বাইরে বলেই বোধহয় স্বর্গলোক নিয়ে মানুষ তত মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এই ধরাধামেই যদি কোন জায়গা স্বর্গের মত মনে হওয়ায় সে 'ভূস্বর্গ'র আখ্যা পেয়ে যায়?
ঠিক যেমনটা সপ্তদশ শতাব্দীতে কাশ্মীর পেয়েছিল তার অসামান্য প্রাকৃতিক শোভায় অভিভূত মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে। তাহলে যে সেই 'ভূস্বর্গ'র দাবিদার হতে অনেকেই হাতের আস্তিন গোটাবে, তাতে আর আশ্চর্য কি?
কিন্তু কে জানত যে সেই 'ভূস্বর্গ কাশ্মীর'ই একদিন 'মৃত্যু উপত্যকা' হয়ে উঠবে। কে জানত গত কয়েক দশক ধরে সংঘাত দীর্ণ সেই ভূস্বর্গেই নারী ও কিশোরীরা সেনা, আধা সেনাবাহিনী এবং জঙ্গিদের দ্বারা ধর্ষণসহ নানা অত্যাচারের শিকার হয়ে উঠবেন।
এবং কে জানত যে, একেবারে সরকারি সিলমোহর লাগিয়েই সেখানকার মেয়েদের মৌলিক অধিকারগুলিও অচিরেই কেড়ে নেওয়া হবে?
ডাল লেক, কাশ্মীর, ০৯-০৯-২০১৯।ছবির কপিরাইটTAUSEEF MUSTAFA
Image captionকাশ্মীর: ভূস্বর্গ এখন 'মৃত্যু উপত্যকা'
ইতিহাস হাতড়াতে গিয়ে দেখছি - মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া ছুঁয়ে থাকা ভারতীয় উপমহাদেশে জম্মু -কাশ্মীরের যে ভৌগোলিক অবস্থান, তাতে প্রাচীন থেকে মধ্য যুগ - ক্রমান্বয়ে হিন্দু, মুঘল, আফগান, শিখ, ডোগরা রাজা বাদশাহদের শাসনে ছিল সে। ফলে সেই উপত্যকায় হিন্দু-বৌদ্ধ-শৈব হয়ে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইসলাম ধর্মও এসে মিশেছে। এবং মনে হয় যুগ যুগ ধরেই সেই নানা ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম্পরা অন্তর্লীন ছিল উপত্যকাবাসীর জীবন চর্যাতেও ।
কিন্তু ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা সংঘাতের মধ্যে দিয়ে দেশভাগ, ভারতের স্বাধীনতা অর্জন এবং পাকিস্তানের জন্ম হয়, তার মধ্যেই যেন এই উপত্যকায় এক অনিঃশেষ দ্বন্দ্ব - সংঘাতের বীজ লুকিয়ে ছিল। কারণ জম্মু-কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রাজা হরি সিং স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত কেন তিনি ভারতের সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের সংযুক্তি মেনে নিয়েছিলেন? (আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন)।
কিন্তু একটি মুসলমান প্রধান প্রদেশ, একটি হিন্দু প্রধান রাষ্ট্রের সঙ্গে আদৌ অন্তর্ভুক্তি চায় কি না, এবং তাতে তাদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-আর্থ-সামাজিক জীবনে সমস্যা হতে পারে কি না, রাজ্যবাসীর কাছে তা জানতে চাননি হরি সিং।
জম্মু-কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রাজা হরি সিংছবির কপিরাইটKEYSTONE-FRANCE/GETTY IMAGES
Image captionজম্মু-কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রাজা হরি সিং।
যে ঐতিহাসিক, ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে দেশের একমাত্র মুসলমান প্রধান রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তি, তাতে হয়তো একটা 'সেফগার্ড'এর প্রয়োজন ছিল। যা সংবিধানের অস্থায়ী ৩৭০ ধারা তাকে দেয়। এবং সেই ধারায় প্রায় ৭০ বছর ধরে রাজ্যটি 'স্পেশাল স্টেটাস'র বিশেষ সুবিধাও পেয়ে এসেছে।
কিন্তু আশ্চর্য, রাজ্যের সেই নিজস্ব সংবিধানই কাশ্মীরি মহিলাদের নানা মৌলিক অধিকার হরণ করে নেয়।
সেই সংবিধানের ৩৫এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপত্যকায় সকলেরই যে 'পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট সার্টিফিকেট' বা পিআরসি থাকা উচিত, তা বাতিল হয়ে যায় যদি কোন কাশ্মীরি মেয়ে পিআরসি নেই এমন পুরুষকে বিয়ে করে।
তখন পিআরসি হোল্ডার'র সমস্ত সুযোগ থেকেই সে বঞ্চিত হয়। সরকারি স্কুল-কলেজে পড়া, কোন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্কলারশিপ, সরকারি অনুদান কিম্বা সরকারি চাকরি পাওয়ার অধিকার সে হারায়।
সেখানে সম্পত্তি কেনা বেচা, এমনকি পারিবারিক বিষয় সম্পত্তির অধিকার থেকেও মেয়েটি বঞ্চিত হয়। তার অধিকার থাকে না নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও।
মুক্তির দাবীতে কাশ্মীরি নারীর বিক্ষোভ, শ্রী নগর, ১৬-০৮-২০১৯।ছবির কপিরাইটHINDUSTAN TIMES
Image captionভারতীয় রাজনীতিকরা কাশ্মীরি নারীদের পণ্য হিসেবে দেখছেন?
অথচ কোন কাশ্মীরি পুরুষ অন্য রাজ্যের বা দেশের কোন মহিলাকে বিয়ে করলেও তার স্টেটাসের কোনই পরিবর্তন হয় না। উপরন্তু তার স্ত্রী কাশ্মীরের 'পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট'র মর্যাদা পেয়ে যায়। (আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন।)
তাই হঠাৎ জম্মু-কাশ্মীর থেকে সেই ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা তুলে নেওয়ায়, ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী কাগজে কলমে অন্তত সমস্ত নারী-পুরুষের সমানাধিকার সেখানেও এবার প্রযোজ্য হবে। সরকারের এই পদক্ষেপে জম্মু-কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ আদৌ উজ্জ্বল হবে, নাকি কাশ্মীরিদের জীবন আরও দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার ঘোর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে, তা এখনই বলা কঠিন।
কিন্তু যেসব কাশ্মীরি মহিলারা তাঁদের জীবনে এই ঘোর বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ওই অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বারবার, তাঁরা অন্তত এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
তবে কাশ্মীরি মেয়েদের জীবনের সুরক্ষা নিয়ে একটা আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
শ্রী নগরে বিক্ষোভের সময় নারীরা পাথর জোগাড়র করছেন, ৩০-০৮-২০১৯।ছবির কপিরাইটANADOLU AGENCY
Image captionকাশ্মীরি নারীর প্রতিক্রিয়া: ভারত সরকারের বিরুদ্ধেই তাঁদের হাতেও পাথর উঠে আসছে।
কারণ, ৩৭০ বাতিল হতে না হতেই বিজেপির নেতা, মন্ত্রীরা যেভাবে উঠে পড়ে 'ফর্সা কাশ্মীরি মেয়ে'দের বউ করে আনার ব্যাপারে অকাশ্মীরিদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, তা শুধু অশালীন ও অরুচিকরই নয়, অত্যন্ত লজ্জাজনকও বটে।
বিজেপি ল'মেকার বিক্রম সাইনি তো তাঁর দলের মুসলমান কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন যে, এখন তাঁরা কাশ্মীরে গিয়ে 'ফেয়ার স্কিনড কাশ্মীরি গার্লস' বিয়ে করে আনতে পারেন। (আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন।)
আসলে যে ঘোর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের চিরকালই পণ্য হিসেবে দেখে এসেছে, তারই জেরে হঠাৎ ভূস্বর্গের নারীদের পাওয়া আয়াসসাধ্য মনে হচ্ছে দেশের বহু পুরুষেরই। তারা যেন খেই হারিয়ে ফেলছেন।
তাই তাঁদের ওই 'ফেয়ার স্কিন্ড গার্লস' পাওয়ার লোভের কাছে বিশেষ করে দরিদ্র কাশ্মীরি মেয়েদের নিরাপত্তা কতটা অটুট থাকবে, তা নিয়ে একটা আশঙ্কা জাগছেই। কারণ বিশ্বে কন্যাশিশু ও নারী পাচারে ভারতের স্থান কিন্তু বেশ ওপরের দিকেই।
তাছাড়া ভারতের সংবিধান নারী পুরুষের সমান অধিকার দিলেও অন্যান্য রাজ্যের বেশিরভাগ মেয়েদের মতো কাশ্মীরি মেয়েরাও যে তার নাগাল পাবে না, তাতে সন্দেহ নেই।
তাই সেখানকার হাজার হাজার 'হাফ উইডো', যাঁদের স্বামী নিখোঁজ, সন্তান নিখোঁজ, তাঁদের হদিশ না পেলে, গণকবরে পরিচয়হীন যারা শুয়ে আছেন, তাঁদের পরিচয় না জানালে, সেনাবাহিনীর হাতে অত্যাচারিত ও নিহতদের সেই হাজার হাজার মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যাদের মনের ক্ষত শুকবে কি করে?
গত কয়েক দশক ধরে ধর্ষণ ও গণধর্ষণে অপরাধীদের শাস্তি না দিলে কাশ্মীর ভূখণ্ডের ওপর হয়তো জাতীয় পতাকা ওড়ানো যাবে। কিন্তু কাশ্মীরি নারী-হৃদয়ের এক ইঞ্চি জায়গাও দেশের শাসকরা পাবেন না। এবং জঙ্গিদের সমর্থনে নয়, ভারত সরকারের বিরুদ্ধেই তাঁদের হাতেও হয়তো তখন পাথর উঠে আসবে।

জর্ডান উপত্যকা: ফিলিস্তিনের যে এলাকা ইসরায়েল নিজের অন্তর্ভূক্ত করতে চায়

জর্ডান উপত্যকা: ফিলিস্তিনের যে এলাকা ইসরায়েল নিজের অন্তর্ভূক্ত করতে চায়

ফিলিস্তিনি তরুণ খেজুর সংগ্রহ করছেন
Image captionফিলিস্তিনি তরুণ খেজুর সংগ্রহ করছেন

১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল বিপুলভাবে জয়ী হওয়ার পর জর্ডান উপত্যকার অধিকাংশ ইসরায়েলের সামরিক এবং প্রশাসনিক দখলে চলে যায়।

তবে উর্বর কিন্তু অনুন্নত এই বিস্তৃত এলাকা - যা পশ্চিম তীরের এক চতুর্থাংশ - সেটিই ভবিষ্যত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ার কথা।
অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, নিরাপত্তার কারণে তারা এই উপত্যকা হাতছাড়া করতে রাজি নয়।
গত অগাস্টে পুনরায় চালু হওয়া শান্তি আলোচনার বিষয়বস্তু গোপনীয় রাখা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এই উপত্যকার ভাগ্য কি দাঁড়ায় তা এই আলোচনার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এবং যা নিয়ে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি মধ্যস্থতাকারীরা একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
জিফটলিকে ফিলিস্তিনি একটি পারিবারিক খামারে খেজুরের ফলন সংগ্রহ মাত্র শেষের দিকে।
কিশোর-কিশোরীরা একটি উঁচু জায়গায় উঠে গাছ থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে পাকা ফল পাড়ে, আর বয়স্করা সেগুলো বাক্সে ভরে।
এই খামারের মালিক হাযা ডারাগমা। তিনি জানালেন, ইসরাইলি দখলের কারণে তার খেজুর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
"ইসরায়েলি কৃষক ফিলিস্তিনি কৃষকের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে। তাদের পানি এবং কাঁচামাল রয়েছে। সরকারি সেবা এবং বাজার সুবিধা পাচ্ছে তারা। তারা খেজুর ইউরোপের বাজারে বিক্রি করছে। আমরা রপ্তানি করতে পারছি না। তাই পশ্চিম তীরে আমরা খুব কম দাম পাচ্ছি"।
ইসরায়েল এবং পশ্চিম তীরের মধ্যকার সমস্ত ক্রসিং পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইল - যা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তাদের পণ্য সরাসরি রফতানি করার ক্ষেত্রে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা পেতে দিচ্ছে না।
অনেকেই তাদের উৎপাদিত পণ্য ইসরায়েলি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে অথবা কেবলমাত্র পশ্চিম তীরের মধ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হচ্ছে।
খামারি হাযার বাবা মাজিদের বয়স ৮০'র ওপরে। তিনি ভূমি বাজেয়াপ্ত করার এবং ইসরায়েলি সামরিক জোনে পরিণত করার আগের দারুণ দিনগুলোর কথা স্মরণ করছিলেন, যখন তিনি জর্ডান নদীর তীরে শস্য আবাদ করতেন।
"আমাদের প্রচুর জমি ছিল। এখন আমাদের হাতে সামান্য পরিমাণে আছে এবং তারা আমাদের আরও ঘিরে ধরেছে" - বলেন অশীতিপর মাজিদ।

আরো পড়তে পারেন:

জর্ডান উপত্যকা
Image captionযে কোনো শান্তি আলোচনায় ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন দু'পক্ষই চায় জর্ডান উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ।

প্রতিরক্ষা রেখা

ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়, যদিও ইসরায়েল তা অস্বীকার করে আসছে।
এই সীমান্ত এলাকায় প্রথম এই প্রতিরক্ষা রেখা স্থাপন করা হয় জাতীয় নিরাপত্তাকে মাথায় রেখে। এখন এই উপত্যকা প্রায় ৯,০০০ বসতিস্থাপনকারীর এবং ৫৬,০০০ ফিলিস্তিনির আবাসস্থল।
ডেভিড এলহায়ানি একটি আঞ্চলিক কাউন্সিলের প্রধান যিনি ২০টির বেশি বসতির প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি বলেন, "জর্ডান উপত্যকার মীমাংসার জন্য সরকার আমাদের পাঠিয়েছে।
"একজন ইহুদি হিসেবে আমি আপনাকে বলতে পারি আমরা কোন ঝুঁকি নিতে পারি না। জর্ডান উপত্যকা ইসরায়েলি সার্বভৌমত্বের অধীনেই থাকতে হবে। আমি বাইবেল থেকে আমাদের দাবির বিষয়ে বলছি না। আমি বলছি নিরাপত্তার কথা। এখানে অবস্থানের মাধ্যমে আমরা তেল আবিব এবং ইসরায়েলের সব মানুষকে রক্ষা করছি"।
"ইসরায়েল এবং আরব দেশগুলোর মধ্যে কিছু একটা ঘটবে, এটা হল তার প্রতিরক্ষা রেখা"।
সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় ইসরাইলি সৈন্যদের দেখা যাবে টহল দিতে। মাইনের উপস্থিতি জানিয়ে সাইনপোস্টগুলোতে রয়েছে সতর্কবার্তা ।
ফিলিস্তিনিদের দ্বারা পশ্চিম তীরের সাথে যোগাযোগে ব্যবহৃত হতে পারে জর্ডানের একমাত্র ক্রসিং অ্যালেনবাই ব্রিজের নিয়ন্ত্রণও ইসরাইলি সীমান্তরক্ষা কর্তৃপক্ষের হাতে।
আবু আজাফা গ্রামে একটি ফিলিস্তিনি পরিবার
Image captionবসতি উৎখাতের কারণে অনেক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যূত হতে বাধ্য হয়েছে

অর্থনৈতিক তাৎপর্য

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার শান্তি আলোচনার তথ্যের অনুপস্থিতি থাকলেও তা দুই পক্ষের নেতাদের জর্ডান উপত্যকা সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থাকে টলাতে পারেনি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার অন্যতম পূর্বসূরী আইজ্যাক রবিনের অক্টোবর মাসে হত্যাকান্ডের বার্ষিকী উপলক্ষে পার্লামেন্ট বৈঠকে বলেছেন, "আমাদের শক্তি আমাদের অস্তিত্ব এবং শান্তির জন্য নিশ্চয়তা ... এর জন্য প্রয়োজন জর্ডান উপত্যকায় একটি নিরাপত্তা সীমান্ত, যেমনটা রবিন তার সর্বশেষ ভাষণে বলেছিলেন"।
অতীতে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস একটি নতুন পুলিশ একাডেমিতে সদ্য স্নাতক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, "ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সীমানা, ডেড সি থেকে শুরু করে জর্ডান উপত্যকা এবং মধ্য উচ্চভূমি হয়ে উত্তর ইসরাইলের বিসান হয়ে ফিলিস্তিনি-জর্ডানি সীমান্ত এবং তেমনই বহাল থাকবে"।
প্রধান ফিলিস্তিনি মধ্যস্থতাকারী সায়েব এরেকাত এই উপত্যকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরতে বিদেশী কূটনীতিক এবং সাংবাদিকদের উপত্যকায় একটি ভ্রমণে নিয়ে যান।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে হিসাব দেখানো হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় ডেড সি'র খনিজ সম্পদকে কাজে লাগাতে পারলে ফিলিস্তিনি অর্থনীতি এক বছরে ৯১৮ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, ইসরাইলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিম তীরের বিভিন্ন অংশে কৃষিজমি এবং পানি সম্পদের আরও অধিকার পেলে তারা বছরে আরও ৭০৪ মিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারবে।
জর্ডান উপত্যকা অঞ্চলটি সবচেয়ে বড় একক অংশ নিয়ে তৈরি যা "সি অঞ্চল" হিসেবে পরিচিত - ইসরাইলের এই অংশে ১৯৯৩ সালে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি চুক্তির অধীনে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি ঝুলে আছে।
মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনার একজন প্রতিনিধিত্বকারী টনি ব্লেয়ার বলেন, "সি অঞ্চলে, যে অঞ্চলটি পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ - ফিলিস্তিনিরা তার উন্নয়নে ধাপে ধাপে সক্ষমতা অর্জন করেছে"।
"জর্ডান উপত্যকায় প্রচুর উর্বর কৃষি জমি রয়েছে। খোলাখুলিভাবে এটা প্রত্যক্ষ করা কঠিন যে, ভবিষ্যতে আপনি এমন একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র পেতে চলেছেন, যার অন্তর্গত এটি নেই"।
মি. ব্লেয়ার বিধিনিষেধ শিথিল করার জন্য চাপ দিচ্ছেন, যার মধ্যে অ্যালেনবাই ব্রিজ খোলা রাখার সময় বাড়ানোর কথাও রয়েছে।
"যেটা আমরা করার চেষ্টা করছি তা হল, আমি মনে করি, এমনকি চূড়ান্ত সমঝোতার আগে, ফিলিস্তিনের পক্ষে একটি অনুভূতি দেয়া যে বিশ্ব বদলে যাচ্ছে এবং তারা তাদের সামনে সত্যিকারের একটি রাষ্ট্র আবির্ভূত হতে দেখবে", বলেন মি. ব্লেয়ার।
"একইভাবে ইসরাইলিদের জন্য অবশ্যই নিরাপত্তার উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে"।

আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা

অতীতের শান্তি আলোচনায় বলা হয়েছিল, জর্ডান উপত্যকায় অল্পকিছু ইসরাইলি নাগরিকের সমন্বয়ে সতর্কতা কেন্দ্র স্থাপনের অস্থায়ী চুক্তি হয়েছে। যদিও মি. নেতানিয়াহু এখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে আরও শক্তিশালী উপস্থিতির পক্ষে বলেছেন। 
ইসরাইলি গণমাধ্যমের রিপোর্টে বলা হয়েছে, জর্ডান উপত্যকায় নতুন একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরির জন্য মি. নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা এবং সীমান্তে পাহারার জন্য আন্তর্জাতিক সৈন্য নিয়োজিত করতে তার প্রধান মধ্যস্থতাকারী যিপি লিভনির সমর্থিত একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
জেরুজালেম সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স-এর প্রেসিডেন্ট ডোর গোল্ড বলেন, "আমাদের অভিজ্ঞতা বলে আন্তর্জাতিক বাহিনী এই কাজটা একেবারে করতে সক্ষম না"।
তিনি বলেন, "ফিলিস্তিনিদের অর্থনৈতিক সাফল্যের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কোনও ভূমিকা নেই এবং আমরা চুক্তিতে পৌঁছাতে পারি যাতে আমরা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় অংশ নিতে পারি।"
"কে জানে সিরিয়ায় কি হতে চলেছে। হয়তো আমরা নতুন এক জিহাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদের পূর্বদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর জন্য বর্তমানে এটাই দুশ্চিন্তার বড় কারণ।"

উত্তেজনা

জর্ডান উপত্যকায় অনেক বাসিন্দা ইসরাইলি এবং ফিলিস্তিনি দুই পক্ষই জানিয়েছে শান্তি আলোচনা চললেও তারা উদ্বেগে-অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
নিয়মিত ঘটনাগুলো এসব অঞ্চলের ব্যাপক সংগ্রামকে তুলে ধরে।
সেপ্টেম্বর মাসে ইসরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনি গ্রাম কিরবাত আল মাখলুল ধ্বংস করে দিয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সেখানে নিবন্ধনবিহীন নির্মাণকাজ চলছিল এবং ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট এই স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে করা এক রিট খারিজ করে দেয়।
যদিও এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দার মুখে পড়েছে। মানবাধিকার গ্রুপগুলো বলছে, জর্ডান উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের জন্য ভবন নির্মাণ অনুমোদন পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার কারণ তাদের ভাষ্যমতে, বৈষম্যমূলক নীতি এজন্য দায়ী। এ অভিযোগ অবশ্য ইসরাইল দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
সরকারি একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, "যখন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, সেটা বৈষম্যের জন্য নয়। প্রকৃতপক্ষে জর্ডান উপত্যকায় যথাযথ অনুরোধ করা হলে ফিলিস্তিনিদের ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। (কিন্তু) জর্ডান উপত্যকা নিরাপত্তা-সংবেদনশীল এলাকা, যেহেতু এটা সীমান্ত এলাকা এবং এসব বিষয় কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যক্তিগত স্থাপনা নির্মাণের জন্য অনুপযুক্ত"।
আবু আল আজাফা গ্রামটি এখন যে কোন সময় গুঁড়িয়ে দেয়া হতে পারে এমন আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একজন বয়স্ক নারী জামিলা আদেইস তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।
নিকটবর্তী মাসুয়া বসতি এলাকা দেখিয়ে তিনি বলেন, "ইসরাইলিরা চায় না যে আমরা এখানে থাকি। লাথি মেরে তারা আমাদের উৎখাত করে দিতে চায় এবং বসতি স্থাপনকারীদের এই জমি দিয়ে দিতে চায়, যাতে করে তারা খেজুর চাষ করতে পারে"।

যদিও ফিলিস্তিনি শ্রমিকরা এইসব বসতি নির্মাণে কাজ করছে, তবে সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অস্বস্তিপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে।

আর গত মাসে জর্ডান উপত্যকায় ব্রোশ হাবিকা সম্প্রদায়ের একজন ইসরাইলি সেটেলারের হত্যা এবং সন্দেহভাজন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তারের পর উত্তেজনা কেবল আরও তীব্র হয়েছে।
কাশ্মীর: সেনা অভিযানের মধ্যে নির্যাতনের অভিযোগ, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি সমর্থন অনেকের

কাশ্মীর: সেনা অভিযানের মধ্যে নির্যাতনের অভিযোগ, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি সমর্থন অনেকের

ভারতের সংবিধান থেকে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার ব্যবস্থা বাতিল করার পর ভারত শাসিত কাশ্মীরের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মারধর এবং নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে অনেকদিন আগে থেকেই।

সেখানাকার একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলেছে বিবিসি। গ্রামবাসীরা অভিযোগ করে যে তাদেরকে তার ও লাঠি দিয়ে মারা হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে।
অনেক গ্রামের বাসিন্দারাই বিবিসিকে ক্ষতচিহ্ন দেখান, কিন্তু কর্তৃপক্ষের সাথে সেসব অভিযোগ সম্পর্কে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভারতের সেনাবাহিনী এসব অভিযোগকে 'ভিত্তিহীন ও প্রমাণসাপেক্ষ নয়' বলে দাবি করেছে।
অগাস্টের ৫ তারিখ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কাশ্মীরকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে কাশ্মীর।
কাশ্মীর অঞ্চলকে ধারণা করা হয় এমন একটি এলাকা হিসেবে যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সামরিক সদস্যদের অবস্থান রয়েছে, তার ওপর বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর সেখানে আরো অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ভারত সরকার।
কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, অ্যক্টিভিস্টসহ প্রায় তিন হাজার মানুষকে আটকও করা হয়েছে।
অনেককেই রাজ্যের বাইরের কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব পদক্ষেপ শুধুই রাজ্যটির জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে।
গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের সেনাবাহিনী কাশ্মীরে সশস্ত্র জঙ্গিবাদ দমনে লড়াই করে যাচ্ছে। ভারতের অভিযোগ, ঐ অঞ্চলের জঙ্গিদের সহায়তা করে পাকিস্তান - যেই অভিযোগ কাশ্মীরের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করা পাকিস্তান সবসময়ই অস্বীকার করেছে।
অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপ করার সিদ্ধান্তকে ভারতের বিভিন্ন অংশের মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী'র এই 'সাহসী' সিদ্ধান্তকে ভারতের গণমাধ্যমও সাধুবাদ জানিয়েছে।
আরো পড়তে পারেন:
একজন ভুক্তভোগীর পায়ে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন
Image captionএকজন ভুক্তভোগীর পায়ে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন, ভারতীয় সেনাদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি
সতর্কতা: নিচের বর্ণনা অনেক পাঠকের কাছে অস্বস্তির কারণ মনে হতে পারে
আমি দক্ষিণ কাশ্মীরের অন্তত ৬টি গ্রামে ঘুরেছি, যেগুলো গত কয়েকবছরে ভারত বিরোধী সশস্ত্র জঙ্গিবাদের উত্থানের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। সেসব গ্রামের সবগুলোতর বাসিন্দাদের কাছ থেকেই নির্যাতনের একই ধরণের বক্তব্য জানতে পারি।
সেসব এলাকার ডাক্তার এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি, তবে গ্রামবাসীরা আমাকে তাদের শরীরের ক্ষত দেখিয়ে দাবি করেছেন যে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা।
একটি গ্রামের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন যে ভারতের সংসদে অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের ঘোষণা আসার সাথে সাথে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালায় সেনাবাহিনী।
একটি গ্রামের দু'জন বাসিন্দা, যারা সম্পর্কে দুই ভাই, বলেন ঐদিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়ি থেকে জোর করে বের করে নিয়ে গিয়ে আরো কয়েকজন গ্রামবাসীর সাথে একসাথে দাঁড় করায়। অন্যান্যদের মত ঐ দুই ভাইও নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চায়নি।
"তারা আমাদের ব্যাপক মারধর করে। আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করি: আমরা কী করেছি? কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি, কিছু বলেওনি, তারা আমাদের মারতেই থাকে," বলেন দুই ভাইয়ের একজন।
"আমার শরীরের প্রতিটি অংশে তারা আঘাত করে। তারা আমাদের লাথি দেয়, লাঠি ও তার দিয়ে মারে, বৈদ্যুতিক শকও দেয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে যখন আমরা অজ্ঞান হয়ে যাই তখন বৈদ্যুতিক শক দিয়ে আমাদের জ্ঞান ফিরিয়ে আনে।"
"লাঠি দিয়ে মারার সময় আমরা যখন চিৎকার করছিলাম, তখন আমাদের মুখ বন্ধ করার জন্য মুখে কাদা ভরে দেয়।"
"আমরা তাদের বারবার বলতে থাকি যে আমরা নির্দোষ। তাদের জিজ্ঞাসা করি কেন আমাদের নির্যাতন করছে। কিন্তু তারা এসব কোনো কথাই শোনেনি।"
একজন গ্রামবাসীর পিঠে নির্যাতনের ফলে হওয়া ক্ষতচিহ্ন
Image captionএকজন গ্রামবাসীর পিঠে নির্যাতনের ফলে হওয়া ক্ষতচিহ্ন
"নির্যাতনের একপর্যায়ে তাদের বলি যে আমাদের মেরো না, এর চেয়ে গুলি করো। একপর্যায়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুনয় করি যেন আমাদের উঠিয়ে নেয়।"
গ্রামের আরেকজন তরুণ জানান, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে কে কে পাথর ছুঁড়ে মেরেছে তাদের নাম বলতে সেনা সদস্যরা তাকে বারবার চাপ দিতে থাকে।
এই তরুণ ও কিশোররা বিগত কয়েকবছর ধরে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের প্রতিমূর্তি হিসেবে অনেকটাই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
ঐ তরুণটি সেনা সদস্যদের বলেন যে, তিনি তাদের নাম জানেন না। তারপর সেনা সদস্যরা তার চশমা, জুতা ও কাপড় খুলতে নির্দেশ দেয়।
"আমার গায়ের কাপড় খোলার পর তারা আমাকে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটায়, প্রায় দু'ঘন্টা যাবত। যখনই অজ্ঞান হয়ে যেতাম, তারা বৈদ্যুতিক শক দিতো আমার জ্ঞান ফেরানোর জন্য।"
"তারা যদি আবারো আমার সাথে এরকম করে, তাহলে আমি যে কোনোভাবে এর প্রতিরোধ করবো। প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নেবো।"
তরুণটি বলে, সৈন্যরা তাকে সতর্ক করে দেয় যে গ্রামের কেউ যদি কোনো ধরণের বিক্ষোভে অংশ নেয় তাহলে তাদের পরিণতিও একই হবে।
গ্রামের মানুষ মনে করে সেনা সদস্যরা এরকম নির্যাতন করেছে যেন গ্রামবাসীরা কোনো ধরণের বিক্ষোভে অংশ নিতে ভয় পায়।
নিরাপত্তারক্সীদের দিকে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুঁড়ে মারলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছবির কপিরাইটABID BHAT
Image captionনিরাপত্তারক্সীদের দিকে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুঁড়ে মারলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে
বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা 'অভিযোগ অনুযায়ী কোনো নাগরিকের সাথে জবরদস্তি করেনি' তারা।
"এধরণের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। এই অভিযোগগুলো শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা থেকে উদ্ধৃত," এরকম দাবি করেন সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল আমান আনন্দ।
বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হলেও 'সেনাবাহিনীর নেয়া পদক্ষেপের কারণে নিহত বা আহত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি' বলে মন্তব্য করেন কর্নেল আনন্দ।
আমরা বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখতে পাই যে সেখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের প্রতি সহানুভূতিশীল।
গ্রামবাসীদের ভাষায়, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা 'মুক্তিযোদ্ধা'।
কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন কেেড়ে নেয়ার পর সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে শ্রীনগরের সৌরা এলাকায়ছবির কপিরাইটABID BHAT
Image captionকাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন কেেড়ে নেয়ার পর সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে শ্রীনগরের সৌরা এলাকায়
কাশ্মীরের এই অঞ্চলের একটি জেলাতেই ফেব্রুয়ারিতে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪০ জনের বেশি ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়। এই অঞ্চলেই ২০১৬ সালে জনপ্রিয় কাশ্মীরী জঙ্গি নেতা বুরহান ওয়ানি নিহত হয়, যার পর কাশ্মীরী তরুণদের অনেকেই ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেয়।
কাশ্মীরের ঐ অঞ্চলে একটি সেনা ক্যাম্প রয়েছে এবং সেখানকার সেনা সদস্যরা নিয়মিত ভিত্তিতে জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদদের খোঁজে ঐ গ্রামগুলোতে তল্লাশি অভিযান চালায়।
তবে গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রায়ই সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বন্দ্বের ভুক্তভোগী হতে হয় তাদেরকে।
একটি গ্রামের একজন তরুণ জানায়, জঙ্গিদের খবর জোগাড় করে না দিলে তার নামে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করা হবে বলে তাকে হুমকি দিয়েছিল সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এই কাজে অস্বীকৃতি জানালে তাকে এমন নির্যাতন করা হয় যে দু'সপ্তাহ পরেও সে সোজা হয়ে বিছানায় শুতে পারছে না।
"এরকম অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবো আমি। তারা আমাদের এমনভাবে মারে যেন আমরা মানুষ না, পশু।"
নির্যাতনের শিকার আরেকজন বলেন অন্তত ১৫-১৬ জন সেনা সদস্য তাকে মাটিতে ফেলে রড, লাঠি, তার দিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে।
"আমার জ্ঞান প্রায় ছিলই না। তারা আমার দাড়ি ধরে এত জোরে টানে যে আমার মনে হচ্ছিল যে আমার দাঁত উপড়ে আসবে।"
পরে জ্ঞান ফিরলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে একজন সৈন্য তার দাড়ি পুড়িয়ে দিতে চাইলেও আরেকজন সৈন্য বাধা দেয়ায় শেষপর্যন্ত তার দাড়ি পুড়ানো হয় নি।
আগে থেকেই বিপুল পরিমাণ সেনা সদস্যের অবস্থান থাকা কাশ্মীরে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত সেনাছবির কপিরাইটGETTY IMAGES
Image captionআগে থেকেই বিপুল পরিমাণ সেনা সদস্যের অবস্থান থাকা কাশ্মীরে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত সেনা
আরেকটি গ্রামে সংবাদদাতা সামির হাশমি এক তরুণের দেখা পান যার ভাই দু'বছর আগে ভারত শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা হিজবুল মুজাহিদিন গোষ্ঠীতে যোগ দেয়।
তরুণটি জানায়, একটি ক্যাম্পে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং সেখান থেকে সে পায়ে ফ্র্যাকচার নিয়ে বের হয়।
"আমার হাত পা বেঁধে উপুর করে ঝুলায় তারা। এরপর দুই ঘন্টার বেশি সময় ধরে আমাকে মারতে থাকে।"
কিন্তু সেনাবাহিনী কোনো ধরণের অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিবিসিকে দেয়া বিবৃতিতে সেনাবাহিনী মন্তব্য করে যে তারা 'পেশাদার একটি সংস্থা যারা মানবাধিকারের বিষয়টি বোঝে এবং সম্মান করে' এবং তারা 'অভিযোগগুলো দ্রুততার সাথে তদন্ত করছে।'
বিবৃতিতে তারা বলে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গত পাঁচ বছরে আনা ৩৭টি অভিযোগের ২০টিই 'ভিত্তিহীন' হিসেবে পেয়েছে তারা। ঐ অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৫টির তদন্ত হচ্ছে এবং 'শুধুমাত্র ৩টি অভিযোগ তদন্ত করার যোগ্য' বলে মন্তব্য করেছে তারা।
ঐ বিবৃতিতে আরো জানানো হয় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
বিবিসি'র আমির পীরজাদা জানান শুরুতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও ধীরে ধীরে তা উত্তপ্ত রুপ নেয়ছবির কপিরাইটABID BHAT
Image captionবিবিসি'র আমির পীরজাদা জানান শুরুতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও ধীরে ধীরে তা উত্তপ্ত রুপ নেয়
তবে গত তিন দশকে কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শতাধিক অভিযোগের সংকলন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দু'টি কাশ্মীরী মানবাধিকার সংস্থা।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্তের উদ্দেশ্যে তদন্ত কমিশন গঠন করার আহ্বান জানিয়েছে। ঐ অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে ৪৯ পাতার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা।
জাতিসংঘের ঐ প্রতিবেদনটিও প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতের কর্তৃপক্ষ।