ইসলামিক গল্প (নিয়তি-২) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলামিক গল্প (নিয়তি-২) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার

 #নিয়তি-২( পর্ব-৯)  । লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

#নিয়তি-২( পর্ব-৯) । লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

 #নিয়তি-২( পর্ব-৯) । লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

.
নিতু ঘুম থেকে উঠে পুরো ঘর তন্ন তন্ন করে তার ফোন খুঁজছে,,, পাগলপ্রায় হয়ে বালিশের আশেপাশে নিচে খুঁজতে লাগলো,, কাল রাতে ফোনে কথা বলে স্পষ্ট মনে আছে সে এটাকে বালিশের নিচে রেখেছে কিন্তু এখন নেই।
নিতুর কপাল থেকে বিন্দু - বিন্দু ঘাম ঝরছে তবে ভয়ে নয় রাগে,, রাগে ও মানুষ ঘামে খুব বেশি রাগে মানুষ ঘামে, কথা বলতে তোতলায়, হাত - পা কাপেঁ,, নিতুর অবশ্য শুধু ঘাম ঝরছে, সে মেরুন রঙের টপস, প্লাজো পড়ে হড়হড় করে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে চাইলো, হঠাৎ কি মনে করে ওড়না দিয়ে নিজের শরীর খানিকটা ঢেকে নিলো।।।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে। তার মনে হলো ঘড়িটা হয় নষ্ট হয়ে গেছে আর না হয় তার চোখে সমস্যা দেখা দিছে।।৷ এতো বেলা অবদি সে ঘুমের রাজ্যে ছিলো অথচ সালেহা বেগম তাকে মোটেও ডাকেনি!! আজ সূর্য কি পশ্চিম দিকেই উঠেছে! না সে আর ভাবতে পারছেনা,, বিছানার পাশ থেকে স্যান্ডেল পরে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো সে।
.
.
সফুরি বেগম যত্নের সাথে মাছ কাটছে,,, প্রতিটি মাছের ভিতরে সে ডিম পাচ্ছে,ভদ্রমহিলা যখনি পেট কেটে ডিম পায় তখনি নাজিফার দিকে হাস্যমুখ করে --- আফা আবার পাইছি।
সফুরির হাসিটা উপভোগ করার জন্যই নাজিফা তার দিকে তাকিয়ে হাসি- হাসি মুখ করে--- আলহামদুলিল্লাহ খালা, আল্লাহ আজকে বরকত দিয়েছে??
--- দিবেনা আফা, আইজ তো বাড়িতে খুশির একখান ব্যাপার হইবো।
--- হু।
--- তায় আফা নিতু আফা যদি রাগ করে?
--- কেন রাগ করবে?
--- এই যে তারে না জানাই এসব করছেন।
--- ওর ভালোর জন্যই করছি, মা ওকে জানাতে নিষেধ করেছে।
--- হের ফর যদি পোলার সামনে কিছু করে বসে।
---- কিছু করতে পারবেনা, আর তুমি
আস্তে কথা বলো খালা নিতুর কানে যেনো না যায়।
--- হু যাইবো না আফা।
নাজিফা ব্যস্ত মুখ করে নাবাকে স্কুল ড্রেস পড়াতে লাগলো,, নাবার বয়স পাঁচে পড়েছে সে এখন স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে সারাদিন নিজের ছোট্ট নাকটা উঁচু করে ময়নাপাখির মতো বকবক করতেই থাকে,,, তার কথা বলার সময় হলেই সে স্বভাব মতো নিজের নাকটা উঁচু করে ফেলে। নাজিফা এখন সেই উঁচু নাকটার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে।
---- মা।
--- বলো মামুনি।
--- আমি ফুপিকে বলে দিবো।
--- কি বলে দিবা।
--- এই যে তুমি স, স স ওনার নাম কি যেনো।
---- ওনার না তোমার জানা লাগবেনা,,,ওনি ও তোমার নানু।
--- হ্যা এই নানুটাকে বললে যে আস্তে কথা বলো খালা নিতুর কানে যাবে।
নাজিফা একটা চোখ উপরের দিকে তুলে নিজের পাঁচ বছরের মেয়েটির দিকে স্তম্ভিত ভাবে তাকালো। আছে। এ যতো বড় হচ্ছে ততই ওর সবকিছু তে কৌতূহল বেড়ে যাচ্ছে, কেউ কোনো কথা বললে সে মনোযোগ দিয়ে ওই কথাগুলো শুনে তার পর সারাদিন সেই কথাগুলোই বলে,,, এটা কি কোনো রোগ????
ফাহমিদা বেশ সেজেগুজে নিচে নামলো, জমকালো মেরুন শাড়ি, চোখে মোটা করে কাজল, ঠোঁটে চকচকে লাল লিপস্টিক,,, হাতে ব্যাসলাইট, নাজিফার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে--- শুনো আমি একটু বাহিরে যাচ্ছি তুমি সবকিছু ম্যানেজ করে নিও।
--- ভাবি আমি একা এতো কিছু কি ভাবে সামলাবো, তোমার একটু হেল্প তো লাগবেই।
----- আমি তা পারবোনা, আমার বান্ধবী ফোন দিয়েছে ওরা কি একটা পার্টি দিয়েছে আমাকে সেখানে যেতেই হবে।
--- এই অবেলা কিসের পার্টি???
---- সবকিছু কি তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে।
নাজিফা চুপসে গেলো। মূর্খদের সাথে কথা বলা মানে নিজের সময় নষ্ট করা। যে কোনোকিছু বুঝতে চায়না তাকে হাজার বললে ও সে বুঝবেনা। নাজিফা জানে এই অবেলায় ফাহমিদার কোনো পার্টিতে যাওয়ার কথা নয়, গেলে সকালে নাস্তার টেবিলেই বেশ বড়সড় একটা ভাষন দিতো ফাহাদ ভাইয়াকে।
মুখে এক লোকমা পাউরুটি নিয়ে বলতো--- শুনো আমি আজকে বাহিরে যাবো।
ফাহাদ হাতের চামচ গুলো রেখে বাঁকা চোখে বলতো--- কোথায় যাবে?
--- আমার আজকে একটা পার্টি আছে।
--- তা বেশ যাওনা।
--- যেতে তো টাকা লাগে।
--- হু সেটা আমি ও জানি।
--- জানলে টাকা দেও।
ফাহাদ বিরস মুখ করে পকেট থেকে হাজার কখানি টাকা ফাহমিদা হাতে তুলে দিতো।ফাহমিদা অবশ্য বুদ্ধি মতী একটা মেয়ে সে জানে ফাহাদ রুমে টাকা চাইলে দিবেনা তাই সে খাবার টেবিলে সবার সামনে টাকা চায়, এক পর্যায় ফাহাদ থতমত মুখ করে টাকা দিয়ে দেয়। আজ ফাহমিদা সে কাজটি করেনি,, এ থেকে বোঝা যায় তার আজ কোনো পার্টি নেই, সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই এমন করছে। কিসের দায়িত্ব? হ্যা একজন ভাবি হয়ে তার ননদের জন্য কিছু করার দায়িত্ব, বাড়ির বড় বউ হয়ে মেহমান দারি করার দায়িত্ব।
আজ দুপুরের দিকে নিতুকে পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে, অবশ্য ভদ্রলোকরা বলেছিলেন, বিকেল নাগাদ আসবে কিন্তু ইমাদ তাদের পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে আসতে হলে যেনো তারা দুপুরে আসে এখানে দুপুরের খাওয়া- দাওয়া সেরে বিশ্রাম নিয়ে তারপর না হয় পাত্রী দেখবে। নিজের বন্ধুর খালাতো ভাই বলে কথা,, আর তাছাড়া সমাদর করার মধ্যে মানুষের আত্মা নিহিত। যে ব্যক্তি মেহমানদারি করতে পছন্দ করে আল্লাহর বরকত ও রহমত দুটোই তার সাথে থাকে।
পাত্রপক্ষ চারজন আসবে,,, তাদের রান্না- বান্না একা নাজিফার পক্ষে সম্ভব নয় তাই সালেহ বেগম কঠিন গলায় ফাহমিদাকে বলে দিয়েছে সে যেনো আজ বাহিরে না যায়। রান্নাঘরে নাজিফার সাথে কাজে সাহায্য করে।
কিন্তু ফাহমিদার কোনো ইচ্ছেই নেই হেসেলে কাজ করার।
সফুরি বেগম নড়েচড়ে বসে--- বড় আফা আপনি বাড়ির বড় বউ, এভাবে সব ফালাইয়া কই যান৷
ফাহমিদা ভ্র কুিঞ্চত করে ---- এই বাড়িতে কাজ করো মাত্র ছমাস, অমনি বাড়ির মালিকেদের ব্যাপারে খবরদারি করা শুরু করেছো।
সফুরি বেগম কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপ করে মেঝের দিকে চেয়ে রইলেন।।। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন চাকরানিদের উচিত নয় মালিকদের ব্যাপারে কথা বলা।
নাজিফা উদাস গলায় নাহিদাকে বললো---ঠিক আছে ব্যাপার নেই, তুমি যাও।
--- তুমি না বললেও আমি যেতাম,,, তুমি আমাকে পারমিশন দেওয়ার কে? যত্তসব।
নাজিফা ফাহমিদার কথায় কর্ণপাত করলো না,,, নাবাকে কোলে নিয়ে সে উপরে চলে গেলো, আজকাল নওরিনের আচরণ ও তার ভালো লাগছেনা মেয়েটি যতোবড় হচ্ছে ততো ঘাড় বেকিয়ে কথা বলছে বড্ড বেয়াড়া স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে। সেদিন ইমাদকে বললো ফোন কিনে দিতে।
ইমাদ তো রেগেমেগে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ইমাদ ও আজকাল প্রত্যেকটা কথায় রাগ করে, দিনদিন ওর রাগটা এতো পরিমান চওড়া হচ্ছে যে খুব ভয় লাগে এই রাগের কারনে আবার না অন্য কিছু হয়ে যায়।
.
.
নিতু মায়ের ঘরের সামনে পায়চারি করছে। মিসেস সালেহা বেগম ওয়াশরুমে,, নিতুর মেজাজ এখন একশো সেন্টিমিটারের উপরে,,, তার মাথায় ধরছেনা কেন তার মা আলমারি থেকে শাড়ি বের করে পুরো বিছানায় ভরিয়ে রেখেছে। কেননা সালেহা বেগম এই কাজটি করা মানে বাড়িতে কোনো মেহমান আসবে তার মানে ভাইয়া যে ছেলের কথা বলছে তারা কি আজ আসবে!!!! আচ্ছা অন্য কোনো ব্যাপার ও তো হতে পারে এই যেমন মা আজ তার বাপের বাড়ি যাবে। না ওখানো তো কেউই নেই নানা- নানী গতো হয়েছেন আর ও চার বছর আগে।
সালেহা বেগন ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নিজের মেয়ের মূর্তির মতো চেহারাটা দেখে বিচলিত হলেন, নিতু কি সব বুঝতে পেরেছে।। সালেহা বেগম চাচ্ছেন না পাত্র পক্ষ আসার আগে নিতু কিছু আঁচ করতে পারুক,, কেননা ও হয়তো বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে পারে,,, আর না ও ফিরে আসতে পারে, এই মেয়ের উপর কোনো বিশ্বাস নেই।
সালেহা হালকা গলায়--- কি ব্যাপার ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন????
নিতু গলার রগ ফুলিয়ে--- এমনি।
--- এমনি- এমনি তুমি আজকাল মায়ের ঘরের সামনে আসোনা, কোনো একটা কারন আছে।
---আমার ফোনটা খুঁজে পাচ্ছি না।
--- তোমার ফোন আর কে ধরবে দেখ গিয়ে
কাল রাতে হয়তো আসার সময় নিয়ে ও আসোনি।
---- আমি এমন ধরনের ভুল করিনা।
---- ফোন রেখে আসা বুঝি মারাত্মক ভুল।
--- হ্যা জঘন্য ভুল, কারন....
---- কারন কি? থেমে গেলে কেন???
---- কিছুনা।
----ভেতরে এসো।
---- আমার ভালো লাগছেনা।
--- ভালো তো এখন লাগবেই না ফোন ছাড়া কি আর তোমার ভালো লাগে।
নিতুর আর কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা, এতো উগ্র মেজাজ নিয়ে সে মায়ের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলছে এটা মার চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য, সকাল থেকে এখন অবদি মোহনের সাথে কথা বলা হয়নি, মোহনের মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটি শুনা হয়নি এতে হৃদয়ে যে কতো খানি ক্ষত হয়েছে তা এদের বোঝার সাধ্য নেই।
---কি হলো কথা বলছো না যে।
---- তুমি বিছানায় এই নতুন শাড়ি গুলো নামিয়ে রেখেছো কেন???
---- শাড়ি চয়েজ করার জন্য।
--- কার জন্য শাড়ি পছন্দ করবে।
--- তোমার জন্য দেখতো কোন শাড়িটা তোমার ভালো লাগে???.
নিতু অনেকক্ষন রাগ চাপিয়ে রেখেছে, এবার সে কিছুটা চেচিঁয়ে --- তুমি কি আমার সাথে মজা করছো? এমনি ফোন পাচ্ছিনা মাথা হ্যাঙ্গ হয়ে রয়েছে তার উপর তোমার ফালতু বকবকানি।
----- এখানে মজার কি হলো, জিন্স,শার্ট, ফতুয়া,পড়তে পারো আর শাড়ির কথা বললাম অমনি মজা হয়ে গেলো!!!,
--- মা তোমাদের কি কোনো মতলব আছে???
--- কিসের মতলব???
--- এই যেমন আমাকে কি কেউ দেখতে আসছে???
----সেটা না হয় কেউ দেখতে আসলে দেখতে পাবে।
--- শুনো মা এ ধরনের ফালতু কাজ তোমরা করবেনা।
---- ফালতু মানে???
--- হ্যা ফালতুই,,,যদি এসব করো তাহলে আমি সুসাইড করবো।
--- বেশ তো করো,, কিভাবে করবে বিষ খেয়ে নাকি সিলিং প্যানের সাথে শাড়ি পেচিয়ে। বিষ খেতে হলে তোমাকে এখন বাহিরে যেতে হবে বিষ কিনতে তার চেয়ে বরং তুমি শাড়ি পেচিয়ে মরো, আমার থেকে শাড়ি ধার নিতে পারো।
নিতু অবিশ্বাস্য চোখ নিয়ে মায়ের দিকে চেয়ে রইলো।।। তার মায়ের এমন আচরণ তার আর সহ্য হচ্ছে না , সে চলে যাচ্ছে। মায়ার ঘরে একটু যেতে হবে তার ফোন থেকে ফোনে কল দিতে হবে,,, সে বুঝতে পারছেনা এক রাতের মধ্যে ফোন কোথাই যেতে পারে? চোরে নিলো নাতো, চোর অবশ্য তার ফোনেই শুধু দেখলো!
সালেহা বেগম মুচকি হাসতে লাগলো তিনি মেয়েকে ভালো করে চেনেন,, কিছু - কিছু মানুষ আছে জীবনকে অতিমাত্রায় ভালোবাসে, বড়ো- বড়ো বিপদে ও মরে যাওয়ার কথা কল্পনা করতে পারেনা, নিতু সে ধরনের একটি মেয়ে এটা অবশ্য নিতুর একটি ভালো গুন।
চলবে
লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

 #নিয়তি-২( পর্ব-৮) । লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

#নিয়তি-২( পর্ব-৮) । লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

 #নিয়তি-২( পর্ব-৮) । লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

রাত প্রায় সাড়ে তিনটা বাজে,, নাজিফা সালেহা বেগমের মাথার পাশে বসে রয়েছে,,,,, হঠ্যাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ---- সাড়ে তিনটা বেজে গেলো,,,, যাই দেখি ইমাদ ঘুমিয়েছে কিনা,, নিতুর চিন্তা করতে-- করতে ওর না আবার আরো শরীর খারাপ হয়ে যায়।
এই ভেবে নাজিফা গেস্ট রুমের দিকে যেতে লাগলো, যেহুতো সালেহা বেগম ওদের রুমে তাই ইমাদ আজ গেস্ট রুমে শুয়েছে। নাজিফা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলো, আশ্চর্য কন্ঠে--- কি ব্যাপার নিতুর রুমে এখন ও লাইট জ্বলছে কেন!!!‌
এখনো মেয়েটি ঘুমায়নি, কি করছে?নাজিফা দরজার মধ্যে কান পাততেই ও পাশ,থেকে নিতুর কান্না মাখা কন্ঠে --- প্লিজ তুমি আমাকে নিয়ে যাও, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবোনা৷ ফেমেলি আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।এই বলেই নিতু চুপ, নাজিফা বুঝতে পারলো মেয়েটি ফোনে কারো সাথে কথা বলছে।
নিতু--- তুমি কি চাও আমি আত্নহত্যা করি?
আল্লাহ এসব কি বলছে নিতু!
আর কাকেই বা বলছে না আমাকে সব জানতে হবে যে করেই হোক।.
.সকাল বেলা পূর্ব পাশের আজানের ধ্বনিতে নাজিফা নামাজ পড়ে, চুপিচুপি নিতুর ঘরে যায়,, গিয়ে দেখে নিতু ঘুমে,,, নাজিফা বারবার ঘরের চারদিকে তাকিয়ে নিতুর ফোনটা খুঁজতে লাগলো, এভাবে কিছুসময় পার হওয়ার পর হঠাৎ চোখ পড়ে নিতুর বালিশের নিচের দিকে,, হাতটা ঢুকিয়ে যেই মাত্র ফোনটা নিবে অমনেই নিতু হাতটা ধরে ফেললো।
নাজিফার গলা শুকিয়ে গেলো, সত্যি কি নিতু জেগে গেছে, সে একটু গাঢ় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলো নিতু গভীর ঘুমে আছন্ন।
নাহ! তাহলে মেয়েটি ঘুমের মধ্যে হাতটা ধরেছে ।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে সে ফোন হাতে নিতুর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। উত্তর দিকের ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজা লাগিয়ে ফোন হাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো নাজিফা । কল লিস্টে একটি নাম্বার খুব বেশি। নাম্বারটি নাজিফার খুব পরিচিত, হ্যা নাজিফা এই নাম্বারটিকে চিনে, এর সাথে যে ওর অতীত মিশে আছে,, মিশে আছে অতীতের সেই জঘন্য দিন গুলো। আচ্ছা দিনগুলো কি আবার ফিরে আসছে, নাজিফা কি আবার সেই দিনগুলোর গভীর অতলে ডুবে যাবে!
ফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দে নাজিফা চিন্তার জগত থেকে বাস্তবতায় ফিরলো।
হ্যা সেই মানুষটায়,ফোন দিয়েছে যার কথা সে ভাবছিলো।
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পুরুষালী কন্ঠটা বলে উঠলো--- হ্যা নিতু বাসার অবস্থা এখন কেমন??? তুমি ঠিক আছ তো????
কাঁপা - কাঁপা ওষ্ঠদ্বয়ে নাজিফা বলে উঠলো ------ আপনি কি মোহন?????
লোকটি কিছুক্ষন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো, তারপর উচ্চ স্বরে হাসতে লাগলো। কি বিদঘুটে সেই হাসি শব্দ ,,, এই হাসিটা নাজিফার কানে বাজে,, পুরনো অতীতের দরজাটা আজ বোধহয় আবার খুলে গেছে।
মোহন হাসি থামিয়ে নরম গলায়--- জান তুমি কেমন আছো????
নাজিফার ইচ্ছে করছিলো ফোনটা রেখে দিতে, এর মতো একটা অমানুষের সাথে কথা বলে নিজের রুচিবোধ কে নিচে নামানোর কোনো মানেই হয়না। তবে মানুষ মাঝেমাঝে চাইলেও অনেক কিছু করতে পারেনা।
নাজিফা ক্ষীণ গলায় --- আপনি কেন আমার ননদের সাথে কথা বলেন।
---শুধু কথা বলিনা জান লিটনের ফ্লাটে গিয়ে শরীরের ও গন্ধ নেই। তুমি তো জানো মেয়েদের প্রতি আমার কি আকর্ষন।
---- ওর সাথে ও আপনি নোংরামো করেছেন?????
--- নোংরামো বলছো কেন,,, আর তাছাড়া তুমি আমাকে আপনি বলছো কেন??? এতো তাড়াতাড়ি আমায় ভুলে গেলে??
--- আপনি আমার উপর শাস্তি নেওয়ার জন্য নিতুকে ব্যবহার করেছেন তাইনা????
---- হা, হা, হাসালে আমায়, দেখ জান আমি কিন্তু জানতাম না নিতু তোমার ননদ,,, ফেসবুকে তো ওর ছবি দেখে আমি ফিদা হয়ে যাই এর জন্য বিভিন্ন কৌশলে ওকে পটিয়ে ওর সাথে আমি দেখা করি,,, ওর ফেমেলি সম্পর্কে খোজ নেই, আলাপচারিতা হয়, তখন আমি জানতে পারি ও তোমার ননদ হয়। আর তোমার ননদ কে কি আমি এতো সহজে ছাড়তে পারি বলো?
---- আপনি ওর সাথে কি করেছেন???
---বোকা মেয়ে কোথাকার, তুমি জানো না আমি কি করতে পারি??? জানো তোমার ননদের বুকের বা পাশে একটা খয়েরী রঙের তিল আছে,,, তিলটা খুবেই সুন্দর,,, প্রতিদিন রাতে আমি সেই তিলকে দেখি সাথে ওর নগ্ন...........
নাজিফা ফোনটা রেখে দেয়,, ওর হাত- পা কাঁপছে ,, মনে হচ্ছে মাঘ মাসের শিতকালে সকাল- সকাল সে এক বালতি ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করে আসছে ।।
ইমাদ দরজা কপাট ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে , সেই দৃশ্য দেখে নাজিফা আঁতকে উঠল। .
.
মায়া ফজরের নামাজ পড়ে বিছানার উপর বসে কিছু একটা পড়ছে বেশ আগ্রহ নিয়েই পড়ছে । এই ডিজিটাল যুগে যেখানে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের সাথে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষ সহজে ফেসবুক, ওয়াটসআপ, টুইটারে কথা বলতে পারে সেখানে কিনা তাকে কেউ একজন চিঠি লিখেছে, তাও আবার সেই আশি নব্বই দশকের মতো বেশ গুছিয়ে। মায়া ভ্রু কুঁচকে চিঠিটা পড়ছে ----
প্রিয় মায়া, কেমন আছেন আপনি????
আপনি কি জানেন আপনি খুবেই রুপবতী একটি মেয়ে। আর রুপবতী মেয়েদের কিন্তু রাত- বিরাতে বাহিরে একা যেতে নেই।
ইতি।
অচেনা শহরের অচেনা মানুষ।
মায়া বুঝতে পারছেনা কে এই চিঠিটা লিখলো,,, লেখাগুলো অবশ্য খুব সুন্দর,,,, রাত - বিরাতে কোথাও যাওয়া বলতে,,, হ্যা মায়ার মনে পড়েছে সে কাল রাতে নীলফামারীতে তার এক বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলো, ভেবেছে খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে কিন্তু বান্ধবী তার একদমেই ছাড়ছিলো না, রাতের খাবার শেষ করে তবেই বের হতে দিলো।
রাত তখন সাড়ে দশটা বাজে,,, সোডিয়ামের আলোয় একলা হাঁটছিলো মায়া আর বাসের সন্ধানে দূর থেকে দূরান্তে তার ক্লান্ত চোখ দুটো তাকিয়ে ছিলো।।।।
তখন কি এই অচেনা ব্যক্তিটি তাকে দেখেছিলো,,, সোডিয়ামের আলোয় নিশ্চুপ রাস্তায় হাঁটার সময় মায়ার কেন জানি মনে হচ্ছিল কেউ একজন তার পিছু নিয়েছে, অতি সাবধানে নিজের পা দুটো ফেলছে , যাতে কারো কান অবদি তার পা ফেলার শব্দ টা না পৌছাতে পারে, তবে মায়ার মনে আছে তার হৃদয় হাজার বার বলে ছিলো একটি বার পিছন ফিরে তাকাতে। কোনো এক অজানা ভয়ে শঙ্কিত হয়ে মায়া পিছু ফিরে তাকায়নি,,, তবে কি এই লোকটিই তাকে অনুসরণ করছিলো,,, কিন্তু এ কি করে এই বাড়ির ঠিকানা জানলো, নাম জানলো????
মায়ার মাথায় বিভিন্ন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তবে সমস্ত প্রশ্নের আড়ালেও তার হৃদয় গহিনে হালকা ভালো লাগা কাজ করছে, কিন্তু কেন এই ভালোলাগা কাজ করছে, তা সে জানেনা।
থাক না কিছু ভালো লাগার কারন না জানাই উত্তম।
.
.
নাজিফা ইমাদকে দেখে হকচকিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো, নাজিফার মনে ভয় হচ্ছে ইমাদ কি সব শুনে ফেললো!!!!
---কি ব্যাপার সকাল- সকাল তোমার মুখটা এমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে কেন নাজিফা ???.
নাজিফা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে --- কই নাতো, তু, তু,তুমি এখানে কি করছো???
--- এরকম আমতাচ্ছো কেন??? আর তুমিই বা এতো ভোরে এই ঘরে কি করছো??? তোমার হাতে ওটা কি????
নাজিফা ফস করে নিশ্বাস ছেড়ে --- কিছু না,, আমার ভালো লাগছিলো না, তাই এ ঘর ওঘরে পায়চারী করছি।
--- সারারাত না ঘুমালে তো খারাপ লাগবেই। এসো ঘুমুতে এসো।
---হু, তুমি নামাজ পড়েছো।
--- হ্যা।
---ঠিক আছে তুমি যাও আমি আসছি।
ইমাদ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে নাজিফা পিছু ডাকলো।
---কিছু বলবে নাজিফা????
--- আসলে নিতুর বিয়ের ব্যাপারটা?
--- ও হ্যা আমি ওদের সাথে কথা বলেছি,,,ওরা বলেছে আজ বিকেলে এক পাক আসতে পারে।
--- হ্যা ওদের তাড়াতাড়ি আসতে বলো,, বিয়ে যতো তাড়াতাড়ি হবে আমি ততো নিশ্চিত হতে পারবো।
--- কিসের নিশ্চিত হতে পারবে????
নাজিফা ভেজা গলায়--- না কিছুনা,, তুমি যাও আমি আসছি।
ইমাদ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই নাজিফা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো,,, আঁচল দিয়ে শক্ত করে নিজের মুখটাকে চেপেঁ ধরলো না এই কান্নার শব্দ ইমাদের কান পর্যন্ত পৌছানো যাবেনা।
নিতুর ফোন বেজে উঠলো, নাজিফার বুক আবার ও ধ্বক করে উঠলো, স্কিনের দিকে তাকিয়ে দেখে মোহনের ম্যাসেজ। ম্যাসেজ পড়তেই মুখের রং টা তার কালো হয়ে যায়।।।।
বড় কোনো বিপদ কি আসছে? ঘনিয়ে আসছে কি কোনো বিভৎস ঘটনা যা জীবন রং টা আবার পাল্টিয়ে দিবে!!
চলবে।
লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

 #নিয়তি-২(পর্ব--৭) । লিখা-- আসমা আক্তার পিংকি।

#নিয়তি-২(পর্ব--৭) । লিখা-- আসমা আক্তার পিংকি।

 #নিয়তি-২(পর্ব--৭) । লিখা-- আসমা আক্তার পিংকি।

শিউলি বেগমের এরুপ কথায় নাজিফা বারবার ওর শাশুড়ির দিকে তাকাচ্ছিলো, কেননা নাজিফার বিশ্বাস ছিলো আল্লাহ সবসময় সত্যের পাশে থাকে,,, আর নিশ্চয় আমার শাশুড়ি বুঝতে পারবেন ছোট মা সত্যি বলছে নাকি মিথ্যে বলছে।
সালেহা বেগম নাজিফার দিকে তাকিয়ে,,, শিউলি বেগমকে বলতে লাগলো--- আমি জানি শিউলি কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যে। আল্লাহ আমাকে বিবেক দিয়েছেন আর সেই বিবেক বলে আমার নাজিফা কখনোই এমন কোনো কাজ করতে পারেনা যার জন্য আমি ওর উপর অসন্তুষ্টি হবো।
নাজিফা সালেহা বেগমের এমন উক্তি শুনে ইমাদের দিকে তাকাতেই দেখে ছেলেটি ইশারা দিয়ে বারবার - বারবার নাজিফাকে হাসতে বলছে৷
নাজিফা মুখে মুচকি হাসি নিয়ে ---- আলহামদুলিল্লাহ।
শিউলি বেগম--- তুই কিন্তু এটা ঠিক করলি না আপা একদিন বুঝবি আমি যা বলেছি সব সত্য।
সালেহা বেগম শিউলি বেগমের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে ,,, নাজিফাকে ইশারা করে ---- নাজিফা মা আমার শরীরটা ভালো লাগছেনা প্লিজ আমাকে একটু ঘরে দিয়ে আয় তো।
এই বলে সালেহা বেগম উঠে দাঁড়াতেই ঠাস,করে নিচে পড়ে গেলো। নাজিফা চিৎকার দিয়ে কাছে গিয়েই সালেহাকে জড়িয়ে ধরলো , ইমাদ বিছানা থেকে নিচে নেমে মাকে ধরে বিছানায় শোয়ায়৷
ভয়- ভয়,কন্ঠে ডাক্তার কে ফোন করে--- হ্যালো ডাক্তার প্লিজ তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়িতে আসুন,, আমার, মা, অজ্ঞান হয়ে গেছে।
নাজিফা ইমাদকে বলতে লাগলো--- প্লিজ তুমি এতো টেনশান করো না,,, উপরে আল্লাহ আছেন নিশ্চয়ই মা ঠিক হয়ে যাবে,, আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।
.
.
.
কিছুক্ষন পর ডাক্তার এসে সালেহা বেগম কে দেখে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ইমাদকে বলতে লাগলো--- আপনার মায়ের এই অবস্থা কেন??
---- মানে???
---- ওনি কি নিয়ে এতো চিন্তা করে।
ইমাদ কিছুই বলতে পারলোনা।
---- দেখুন ওনি যে ভাবে টেনশান করছে এতে ওনার প্রেশার, ডাইবেটিস একে বারে হাই হয়ে যাচ্ছে৷ এভাবে চলতে থাকলে ওনি যখন - তখন স্টোর্ক করতে পারেন,,, প্লিজ ওনাকে চিন্তা থেকে দূরে রাখুন, ঘুমাতে বলুন, আর এই ঔষধ গুলো আপাদত খাওয়াবেন তারপর কি হয় শরীর অবস্থা আমাকে জানাবেন।
.
.
.
ডাক্তার যেতেই নাজিফা রুমে ঢুকে দেখে ইমাদ মাথায় হাত দিয়ে বসে রয়েছে।
নাজিফা--- কি হয়েছে ডাক্তার কি বলেছে???
ইমাদ--- কি আর বলবে তুমি যা ভয় পেয়েছো তাই হয়েছে।
---- মাকে কতবার বললাম এভাবে টেনশান করবেন না, কিন্তু কে শুনে কার কথা।
ইমাদ রেগেমেগে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে,কাঁচের ফুলদানিটা হাতে নিতেই,,
নাজিফা--- কি নিতুর উপর রাগ উঠেছে৷ এখন, ফুলদানি টা ভাঙবে, নিজের হাত আবার ও কাঁটবে,,এই সবেই করবে,, কখনোই আল্লাহর জন্য নিজের রাগটাকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করবেনা আর কখনোই আমার কষ্ট টাও বুঝলেনা।
ইমাদ নাজিফার মুখের পানে চেয়ে ফুলদানি টা রেখে দিলো,,, তারপর সালেহার মাথার পাশে বসে ---- মা তোমার কিছু হবেনা, কিচ্ছু না।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর সালেহা বেগমের জ্ঞান ফিরতেই ওনি বারবার - বারবার নাজিফাকে ডাকতে লাগলো।
ঘর ভর্তি বাড়ির সবাই ব্যাপারটাকে ভালো ভাবে নেয়নি, বিশেষ করে শিউলি বেগম আর ফাহমিদা।
শিউলি বেগম ভ্রু কুঁচকে --- মেয়েটি জাদু পারে নিশ্চয়।
কথাটি ইমাদের কানে যেতেই, ইমাদ যেই বড় চোখে ওনার দিকে তাকালেন অমনেই ওনি চুপ হয়ে গেলেন।
নাজিফা সালেহা বেগমের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে--- মা এই যে আমি কি কষ্ট হচ্ছে আপনার।
সালেহা বেগম টপটপ করে চোখের জল ফেলে--- মা প্লিজ তুই ইমাদকে বল যতো তাড়াতাড়ি পারে নিতুর বিয়েটা দিয়ে দিতে,, আমার খুব ভয় হয় না জানি ও কোন গুনাহের মধ্যে দিনদিন লিপ্ত হচ্ছে। একবার ভাব মা, সেই সকালে বের হয়ে যায় রাতে আসে,,, আমরা কেউ জানি না সারাদিন ও কার সাথে থাকে, কি করে। মা আমার খুব ভয় লাগছে শেষমেশ ও নাকি আমার মুখে চুনকালি দেয়। ওর যতদিন বিয়ে না হচ্ছে ততদিন আমার শান্তি নেই।
নাজিফা বুঝতে পারছিলো না ওর শাশুড়িকে কি বলে শান্তনা দেওয়া উচিত,,,,মেয়েটি ও কতরাত এই ভাবনায় নির্ঘুম ছিলো,,, সাধারনত এই বয়সের মেয়েরা খুব বেশি আবেগী প্রবন হয়, এরা আবেগের বর্শে এতো বেশি ভুল করে যা পুরো জীবনটাকে ছারখার করে দেয়, আর নিতুর মতো একটা মেয়ে যে কোনটা ভুল , কোনটা ঠিক তাও জানেনা, সে খুব সহজেই ভুল কাজ করে জীবনটাকে জটিল করে ফেলতে পারে।
.
.
নাজিফা সালেহা বেগমের কানের কাছে নিজের মুখটাকে নিয়ে--- আপনি কোনো চিন্তা করবেন না আমি ওয়াদা দিচ্ছি আমার জীবন থাকতে আমি ওকে সমস্ত খারাপ জিনিস থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবো, আর খুব শিঘ্রই ভালো একটি ছেলের হাতে ওকে তুলে দিবো,ইনশাআল্লাহ।
সালেহা বেগম নাজিফার কথায়, শান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললো,,, না এই মেয়েটিই নিতুকে আলোর পথে আনবে,,, আল্লাহ আমার মেয়েটিকে হেদায়েত দান করো। সালেহা বেগম নাজিফার দিকে তাকিয়ে আস্তে - আস্তে চোখ দুটো বন্ধ করে দিলো।
.
.
নাজিফা ইমাদের কাছে গিয়ে ---- আমি চাই এই সপ্তাহের মধ্যে যেনো নিতুর বিয়ে হয়ে যায়।
ফাহাদ নাজিফার কথা শুনে কিছুটা রেগে--- মগের মুল্লুক পেয়েছো নাকি। আর তাছাড়া তুমি কে যে তোমার কথামতো সব হবে।
---- এটা আমার কথা না ভাইয়া, এটাই মায়ের ইচ্ছে এবং মাকে আপনি সুস্থ দেখতে চাইলে এটা করতেই হবে।
ফাহাদ--- তোমাদের যা ইচ্ছে তা করো,, আফটারওল এখন তো এই বাড়ির মালিকেই তুমি।
ইমাদ--- এভাবে কথা বলছো কেন দাদাভাই,,,, নাজিফা কি ভুল বলেছে যে তোমার এভাবে আচরণ করতে হবে।।।
ফাহমিদা---- ইমাদ ইদানিং তুমি তোমার ভাইয়ের মুখের উপরে ও কথা বলো!!!! অবশ্য বলবে নাইবা কেন,, এখন তো নাজিফাই তোমার সব।
ইমাদ--- বৌ মনি আমি কিন্তু কথাটা ঠিক ওভাবে বলিনি।
ফাহাদ--- থাক তোর আর সাফাই দেওয়া লাগবেনা।।
এনিওয়ে তোরা যা বুঝিস তা কর,, আমি এই ব্যাপারে নেই।।
এই বলে ফাহাদ - ফাহমিদা দুজনেই চলে গেলো।
শিউলি বেগম ও নাজিফার উপর রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
নাজিফা বারবার ইমাদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস,ফেলে --- জীবনটা এতো জটিল কেন মাঝেমাঝে বুঝে উঠতে পারিনা। যতই জীবনটাকে সহজ করার জন্য সবকিছু মেনে নেই ততই সেটা জটিল হয়ে যায়। এই জটিলতার শেষ কোথায় কে বলতে পারে।
.
.
.
রাত প্রায় সাড়ে ১২ টা,,, সবাই নিচে বসে রয়েছে, নিতুর আসার কোনো খবরেই নেই।
সালেহা বেগমের কানে যাতে খবরটা না যায় নাজিফা বারংবার তাই চেস্টা করছে।
ইমাদ সোফায় গম্ভীর ভাবে বসে রয়েছে,,,
----- আজ হয় নিতু এই বাড়িতে থাকবে না হয় আমি।
শিউলি বেগম--- তার মানে কি তুই কি আজকে ওকে বাসায় জায়গা দিবিনা???
নাজিফা ফোন টিপতে-টিপতে ইমাদের সামনে এসে ---- এরুপ কিছু করোনা যাতে মায়ের কানে সব সত্যটা চলে যায়।
মায়া--- তুমি কি এখনো ওকে ফোন করে যাচ্ছ?
---- হ্যা ফোনে রিং হচ্ছে কিন্তু ও ধরছেনা।
ইমাদ--- একটা ভদ্র বাড়ির মেয়ে এতো রাত অবদি কখনোই বাহিরে থাকেনা,,, আজ যদি মায়ের কানে এসব যায় তাহলে মা যেটুকু বেঁচে আছে সেটুকু,.....
এই বলে ইমাদ চুপ হয়ে যায়। রাত প্রায় একটা একটা শিউলি বেগম,, মায়া দুজনেই নিজেদের রুমে চলে গেছে, ফাহাদ- ফাহমিদা তো ইমাদের সাথে সেই যে কথা বলে নিজেদের রুমে ঢুকলো, ভুল করে ও আর বের হলোনা৷
নাজিফা--- ইমাদ আমি বলি কি তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো আমি দেখছি কি করা যায়।
ইমাদ--- আমি বললাম না নাজিফা আজ হয় এই বাড়িতে নিতু থাকবে না হয় আমি।
---- প্লিজ এভাবে বলোনা, সবাইকে রাগ, বকা এগুলো দিয়ে সোজা পথে আনা যায় না,, কিছু- কিছু মানুষের সাথে নম্রতা- ভদ্রতা করে, ভালোবাসা দিয়ে ওদের কে আলোর পথে আনতে হয়।
ইমাদ --- নাজিফা প্লিজ তুমি ওকে এভাবে প্রশয় দিয়োনা, ও একটা মেয়ে তার উপর অবিবাহিত,,,, ও যদি এভাবে রাত- বিরাতে বাড়ির বাহিরে থাকে তাহলে তো লোকসমাজে আমরা চলতে পারবোনা।
---- আচ্ছা যা হবার সকালে হবে কিন্তু এখন কিছুই বলবেনা ওকে। ও বাড়ি ফিরলে যা বলার আমি বলবো।
---- কিন্তু ও বাড়ি ফিরলে তো।
.
.
.
রাত প্রায় ১.৩০ হঠাৎ কনিংবেলের আওয়াজ। নাজিফার দরজা খোলার সাথে -- সাথে মেয়েটি ড্রিংক করে হেলে দুলে নাজিফার গায়ের উপর পড়লো। নাজিফা ভালো করে ওর দিকে তাকিয়ে দেখলো-- সকালে যে ড্রেসটা পড়ে গেছে তা গায়ে নেই,,,একটা পাতলা লাল- খয়েরী গেঞ্জি আর জিন্স।
কি ব্যাপার ও আবার ড্রেস চেঞ্জ করলো কোথায়, আর এই ড্রেসেই বা পেলো কোথায়৷ দেখে তো মনে হয় মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছে,, কিন্তু ড্রিংক করে তো একা বাড়ি ফিরা ওর পক্ষে সম্ভব নয় তাহলে কে ওকে বাড়ি দিয়ে গেলো!!
ইমাদ কোনো কথা না বলেই নাজিফার কাছ থেকে নিতুকে ধরে দাঁড় করিয়ে কষে একটা থাপ্পড় দিলো।
নিতু কান্না করতে- করতে--- এই তুই আমাকে মারার কে??
--- আমি কে, এখনি দেখাচ্ছি আমি কে।
এই বলে ইমাদ আরেকটা থাপ্পড় দিতে গেলে নাজিফা হাতটা ধরে --- তুমি কি পাগল হয়ে গেছো??
---- হ্যা, হ্যা আমি পাগল হয়ে গেছি,,, যেই কাজটা আজ ও করেছে,,, সেই কাজটা আমি কেন দাদাভাই ও কখনো ভুল করেও করেছে কিনা সন্দেহ আছে।
---- আমি বুঝতে পারছি বাট প্লিজ আস্তে কথা বলো, আর এখন প্লিজ আর কিছুই করোনা মায়ের শরীর ঠিক নেই, তুমি কেন বুঝচ্ছ না এই ব্যাপারটা ওনি জানতে পারলে কতটা কষ্ট পাবে, ওনার শরীরের কন্ডিশন কতটা খারাপ হবে।
বড্ড জেদি ছেলেটা নাজিফার কথার গুরুত্বই দিলোনা, হাতের কাছে থাকা ডাইনিং টেবিল থেকে বড় জগের একজগ পানি নিতুর মাথায়, মুখে ঢেলে দিলো।
পানির স্পর্শে নিশার ঘোর থেকে মেয়েটি বেরিয়ে আসলো, জোরে চিৎকার দিয়ে--- তুই আমার মাথায় পানি ঢাললি কেন???
--- চুপ একদম চুপ।
নাজিফা ইমাদকে ধমকি দিয়ে--- তুমি কি চাচ্ছো বলোতো?? কতবার বললাম সকালটা হতে দেও এখন এসব বাদ দেও,,, তারপর ও তুমি আমার কথা শুনছোনা।
ইমাদ---ঠিক আছে, কালকে সকালে ওর সাথে আমার হিসাব নিকাশ হবে। জাস্ট মায়ের শরীর খারাপ এর জন্য ওকে এই বাড়িতে এখন জায়গা দিলাম।
এই বলে ইমাদ চলে যেতেই, নাজিফা নিতুর সাথে নরম করে কথা বলতে লাগলো, যাতে মেয়েটি এই মাঝ রাতে চেচাঁমেচি না করে শান্ত ভাবে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
--- এতো রাতে বাহিরে থাকা উচিত হয়নি যাও ঘরে যাও।
অমনেই নিতু ও কোনো কথা না বলে ঘরে চলে গেলো।
নাজিফা ভাবতে লাগলো--- আমরা কতটা আল্লাহর অবাধ্য হয়ে চলি, কতটা নাফরমানি করি,, কিন্তু তবুও ওনি আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরান না।
.
.
.
রাত প্রায় সাড়ে তিনটা বাজে,, নাজিফা সালেহা বেগমের মাথার পাশে বসে রয়েছে,,,,, হঠ্যাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ---- সাড়ে তিনটা বেজে গেলো,,,, যাই দেখি ইমাদ ঘুমিয়েছে কিনা,, নিতুর চিন্তা করতে-- করতে ওর না আবার আরো শরীর খারাপ হয়ে যায়।
এই ভেবে নাজিফা গেস্ট রুমের দিকে যেতে লাগলো, যেহুতো সালেহা বেগম ওদের রুমে তাই ইমাদ আজ গেস্ট রুমে শুয়েছে। নাজিফা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলো, আশ্চর্য কন্ঠে--- কি ব্যাপার নিতুর রুমে এখন ও লাইট জ্বলছে কেন!!!‌ এখনো মেয়েটি ঘুমায়নি, কি করছে?
নাজিফা দরজার মধ্যে কান পাততেই ও পাশ,থেকে নিতুর কান্না মাখা কন্ঠে --- প্লিজ তুমি আমাকে নিয়ে যাও, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবোনা৷ ফেমেলি আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।
এই বলেই নিতু চুপ, নাজিফা বুঝতে পারলো মেয়েটি ফোনে কারো সাথে কথা বলছে।
নিতু--- তুমি কি চাও আমি আত্নহত্যা করি?
আল্লাহ এসব কি বলছে নিতু! আর কাকেই বা বলছে না আমাকে সব জানতে হবে যে করেই হোক।
.
.
সকাল বেলা পূর্ব পাশের আজানের ধ্বনিতে নাজিফা নামাজ পড়ে, চুপিচুপি নিতুর ঘরে যায়,, গিয়ে দেখে নিতু ঘুমে,,, নাজিফা বারবার ঘরের চারদিকে তাকিয়ে নিতুর ফোনটা খুঁজতে লাগলো, এভাবে কিছুসময় পার হওয়ার পর হঠাৎ চোখ পড়ে নিতুর বালিশের নিচের দিকে,, হাতটা ঢুকিয়ে যেই মাত্র ফোনটা নিবে অমনেই নিতু হাতটা ধরে ফেললো।
(চলবে)
লিখা-- আসমা আক্তার পিংকি।