মঙ্গলবার

#নিয়তি-২( পর্ব-৯) । লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

 #নিয়তি-২( পর্ব-৯) । লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।

.
নিতু ঘুম থেকে উঠে পুরো ঘর তন্ন তন্ন করে তার ফোন খুঁজছে,,, পাগলপ্রায় হয়ে বালিশের আশেপাশে নিচে খুঁজতে লাগলো,, কাল রাতে ফোনে কথা বলে স্পষ্ট মনে আছে সে এটাকে বালিশের নিচে রেখেছে কিন্তু এখন নেই।
নিতুর কপাল থেকে বিন্দু - বিন্দু ঘাম ঝরছে তবে ভয়ে নয় রাগে,, রাগে ও মানুষ ঘামে খুব বেশি রাগে মানুষ ঘামে, কথা বলতে তোতলায়, হাত - পা কাপেঁ,, নিতুর অবশ্য শুধু ঘাম ঝরছে, সে মেরুন রঙের টপস, প্লাজো পড়ে হড়হড় করে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে চাইলো, হঠাৎ কি মনে করে ওড়না দিয়ে নিজের শরীর খানিকটা ঢেকে নিলো।।।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে। তার মনে হলো ঘড়িটা হয় নষ্ট হয়ে গেছে আর না হয় তার চোখে সমস্যা দেখা দিছে।।৷ এতো বেলা অবদি সে ঘুমের রাজ্যে ছিলো অথচ সালেহা বেগম তাকে মোটেও ডাকেনি!! আজ সূর্য কি পশ্চিম দিকেই উঠেছে! না সে আর ভাবতে পারছেনা,, বিছানার পাশ থেকে স্যান্ডেল পরে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো সে।
.
.
সফুরি বেগম যত্নের সাথে মাছ কাটছে,,, প্রতিটি মাছের ভিতরে সে ডিম পাচ্ছে,ভদ্রমহিলা যখনি পেট কেটে ডিম পায় তখনি নাজিফার দিকে হাস্যমুখ করে --- আফা আবার পাইছি।
সফুরির হাসিটা উপভোগ করার জন্যই নাজিফা তার দিকে তাকিয়ে হাসি- হাসি মুখ করে--- আলহামদুলিল্লাহ খালা, আল্লাহ আজকে বরকত দিয়েছে??
--- দিবেনা আফা, আইজ তো বাড়িতে খুশির একখান ব্যাপার হইবো।
--- হু।
--- তায় আফা নিতু আফা যদি রাগ করে?
--- কেন রাগ করবে?
--- এই যে তারে না জানাই এসব করছেন।
--- ওর ভালোর জন্যই করছি, মা ওকে জানাতে নিষেধ করেছে।
--- হের ফর যদি পোলার সামনে কিছু করে বসে।
---- কিছু করতে পারবেনা, আর তুমি
আস্তে কথা বলো খালা নিতুর কানে যেনো না যায়।
--- হু যাইবো না আফা।
নাজিফা ব্যস্ত মুখ করে নাবাকে স্কুল ড্রেস পড়াতে লাগলো,, নাবার বয়স পাঁচে পড়েছে সে এখন স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে সারাদিন নিজের ছোট্ট নাকটা উঁচু করে ময়নাপাখির মতো বকবক করতেই থাকে,,, তার কথা বলার সময় হলেই সে স্বভাব মতো নিজের নাকটা উঁচু করে ফেলে। নাজিফা এখন সেই উঁচু নাকটার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে।
---- মা।
--- বলো মামুনি।
--- আমি ফুপিকে বলে দিবো।
--- কি বলে দিবা।
--- এই যে তুমি স, স স ওনার নাম কি যেনো।
---- ওনার না তোমার জানা লাগবেনা,,,ওনি ও তোমার নানু।
--- হ্যা এই নানুটাকে বললে যে আস্তে কথা বলো খালা নিতুর কানে যাবে।
নাজিফা একটা চোখ উপরের দিকে তুলে নিজের পাঁচ বছরের মেয়েটির দিকে স্তম্ভিত ভাবে তাকালো। আছে। এ যতো বড় হচ্ছে ততই ওর সবকিছু তে কৌতূহল বেড়ে যাচ্ছে, কেউ কোনো কথা বললে সে মনোযোগ দিয়ে ওই কথাগুলো শুনে তার পর সারাদিন সেই কথাগুলোই বলে,,, এটা কি কোনো রোগ????
ফাহমিদা বেশ সেজেগুজে নিচে নামলো, জমকালো মেরুন শাড়ি, চোখে মোটা করে কাজল, ঠোঁটে চকচকে লাল লিপস্টিক,,, হাতে ব্যাসলাইট, নাজিফার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে--- শুনো আমি একটু বাহিরে যাচ্ছি তুমি সবকিছু ম্যানেজ করে নিও।
--- ভাবি আমি একা এতো কিছু কি ভাবে সামলাবো, তোমার একটু হেল্প তো লাগবেই।
----- আমি তা পারবোনা, আমার বান্ধবী ফোন দিয়েছে ওরা কি একটা পার্টি দিয়েছে আমাকে সেখানে যেতেই হবে।
--- এই অবেলা কিসের পার্টি???
---- সবকিছু কি তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে।
নাজিফা চুপসে গেলো। মূর্খদের সাথে কথা বলা মানে নিজের সময় নষ্ট করা। যে কোনোকিছু বুঝতে চায়না তাকে হাজার বললে ও সে বুঝবেনা। নাজিফা জানে এই অবেলায় ফাহমিদার কোনো পার্টিতে যাওয়ার কথা নয়, গেলে সকালে নাস্তার টেবিলেই বেশ বড়সড় একটা ভাষন দিতো ফাহাদ ভাইয়াকে।
মুখে এক লোকমা পাউরুটি নিয়ে বলতো--- শুনো আমি আজকে বাহিরে যাবো।
ফাহাদ হাতের চামচ গুলো রেখে বাঁকা চোখে বলতো--- কোথায় যাবে?
--- আমার আজকে একটা পার্টি আছে।
--- তা বেশ যাওনা।
--- যেতে তো টাকা লাগে।
--- হু সেটা আমি ও জানি।
--- জানলে টাকা দেও।
ফাহাদ বিরস মুখ করে পকেট থেকে হাজার কখানি টাকা ফাহমিদা হাতে তুলে দিতো।ফাহমিদা অবশ্য বুদ্ধি মতী একটা মেয়ে সে জানে ফাহাদ রুমে টাকা চাইলে দিবেনা তাই সে খাবার টেবিলে সবার সামনে টাকা চায়, এক পর্যায় ফাহাদ থতমত মুখ করে টাকা দিয়ে দেয়। আজ ফাহমিদা সে কাজটি করেনি,, এ থেকে বোঝা যায় তার আজ কোনো পার্টি নেই, সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই এমন করছে। কিসের দায়িত্ব? হ্যা একজন ভাবি হয়ে তার ননদের জন্য কিছু করার দায়িত্ব, বাড়ির বড় বউ হয়ে মেহমান দারি করার দায়িত্ব।
আজ দুপুরের দিকে নিতুকে পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে, অবশ্য ভদ্রলোকরা বলেছিলেন, বিকেল নাগাদ আসবে কিন্তু ইমাদ তাদের পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে আসতে হলে যেনো তারা দুপুরে আসে এখানে দুপুরের খাওয়া- দাওয়া সেরে বিশ্রাম নিয়ে তারপর না হয় পাত্রী দেখবে। নিজের বন্ধুর খালাতো ভাই বলে কথা,, আর তাছাড়া সমাদর করার মধ্যে মানুষের আত্মা নিহিত। যে ব্যক্তি মেহমানদারি করতে পছন্দ করে আল্লাহর বরকত ও রহমত দুটোই তার সাথে থাকে।
পাত্রপক্ষ চারজন আসবে,,, তাদের রান্না- বান্না একা নাজিফার পক্ষে সম্ভব নয় তাই সালেহ বেগম কঠিন গলায় ফাহমিদাকে বলে দিয়েছে সে যেনো আজ বাহিরে না যায়। রান্নাঘরে নাজিফার সাথে কাজে সাহায্য করে।
কিন্তু ফাহমিদার কোনো ইচ্ছেই নেই হেসেলে কাজ করার।
সফুরি বেগম নড়েচড়ে বসে--- বড় আফা আপনি বাড়ির বড় বউ, এভাবে সব ফালাইয়া কই যান৷
ফাহমিদা ভ্র কুিঞ্চত করে ---- এই বাড়িতে কাজ করো মাত্র ছমাস, অমনি বাড়ির মালিকেদের ব্যাপারে খবরদারি করা শুরু করেছো।
সফুরি বেগম কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপ করে মেঝের দিকে চেয়ে রইলেন।।। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন চাকরানিদের উচিত নয় মালিকদের ব্যাপারে কথা বলা।
নাজিফা উদাস গলায় নাহিদাকে বললো---ঠিক আছে ব্যাপার নেই, তুমি যাও।
--- তুমি না বললেও আমি যেতাম,,, তুমি আমাকে পারমিশন দেওয়ার কে? যত্তসব।
নাজিফা ফাহমিদার কথায় কর্ণপাত করলো না,,, নাবাকে কোলে নিয়ে সে উপরে চলে গেলো, আজকাল নওরিনের আচরণ ও তার ভালো লাগছেনা মেয়েটি যতোবড় হচ্ছে ততো ঘাড় বেকিয়ে কথা বলছে বড্ড বেয়াড়া স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে। সেদিন ইমাদকে বললো ফোন কিনে দিতে।
ইমাদ তো রেগেমেগে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ইমাদ ও আজকাল প্রত্যেকটা কথায় রাগ করে, দিনদিন ওর রাগটা এতো পরিমান চওড়া হচ্ছে যে খুব ভয় লাগে এই রাগের কারনে আবার না অন্য কিছু হয়ে যায়।
.
.
নিতু মায়ের ঘরের সামনে পায়চারি করছে। মিসেস সালেহা বেগম ওয়াশরুমে,, নিতুর মেজাজ এখন একশো সেন্টিমিটারের উপরে,,, তার মাথায় ধরছেনা কেন তার মা আলমারি থেকে শাড়ি বের করে পুরো বিছানায় ভরিয়ে রেখেছে। কেননা সালেহা বেগম এই কাজটি করা মানে বাড়িতে কোনো মেহমান আসবে তার মানে ভাইয়া যে ছেলের কথা বলছে তারা কি আজ আসবে!!!! আচ্ছা অন্য কোনো ব্যাপার ও তো হতে পারে এই যেমন মা আজ তার বাপের বাড়ি যাবে। না ওখানো তো কেউই নেই নানা- নানী গতো হয়েছেন আর ও চার বছর আগে।
সালেহা বেগন ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নিজের মেয়ের মূর্তির মতো চেহারাটা দেখে বিচলিত হলেন, নিতু কি সব বুঝতে পেরেছে।। সালেহা বেগম চাচ্ছেন না পাত্র পক্ষ আসার আগে নিতু কিছু আঁচ করতে পারুক,, কেননা ও হয়তো বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে পারে,,, আর না ও ফিরে আসতে পারে, এই মেয়ের উপর কোনো বিশ্বাস নেই।
সালেহা হালকা গলায়--- কি ব্যাপার ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন????
নিতু গলার রগ ফুলিয়ে--- এমনি।
--- এমনি- এমনি তুমি আজকাল মায়ের ঘরের সামনে আসোনা, কোনো একটা কারন আছে।
---আমার ফোনটা খুঁজে পাচ্ছি না।
--- তোমার ফোন আর কে ধরবে দেখ গিয়ে
কাল রাতে হয়তো আসার সময় নিয়ে ও আসোনি।
---- আমি এমন ধরনের ভুল করিনা।
---- ফোন রেখে আসা বুঝি মারাত্মক ভুল।
--- হ্যা জঘন্য ভুল, কারন....
---- কারন কি? থেমে গেলে কেন???
---- কিছুনা।
----ভেতরে এসো।
---- আমার ভালো লাগছেনা।
--- ভালো তো এখন লাগবেই না ফোন ছাড়া কি আর তোমার ভালো লাগে।
নিতুর আর কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা, এতো উগ্র মেজাজ নিয়ে সে মায়ের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলছে এটা মার চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য, সকাল থেকে এখন অবদি মোহনের সাথে কথা বলা হয়নি, মোহনের মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটি শুনা হয়নি এতে হৃদয়ে যে কতো খানি ক্ষত হয়েছে তা এদের বোঝার সাধ্য নেই।
---কি হলো কথা বলছো না যে।
---- তুমি বিছানায় এই নতুন শাড়ি গুলো নামিয়ে রেখেছো কেন???
---- শাড়ি চয়েজ করার জন্য।
--- কার জন্য শাড়ি পছন্দ করবে।
--- তোমার জন্য দেখতো কোন শাড়িটা তোমার ভালো লাগে???.
নিতু অনেকক্ষন রাগ চাপিয়ে রেখেছে, এবার সে কিছুটা চেচিঁয়ে --- তুমি কি আমার সাথে মজা করছো? এমনি ফোন পাচ্ছিনা মাথা হ্যাঙ্গ হয়ে রয়েছে তার উপর তোমার ফালতু বকবকানি।
----- এখানে মজার কি হলো, জিন্স,শার্ট, ফতুয়া,পড়তে পারো আর শাড়ির কথা বললাম অমনি মজা হয়ে গেলো!!!,
--- মা তোমাদের কি কোনো মতলব আছে???
--- কিসের মতলব???
--- এই যেমন আমাকে কি কেউ দেখতে আসছে???
----সেটা না হয় কেউ দেখতে আসলে দেখতে পাবে।
--- শুনো মা এ ধরনের ফালতু কাজ তোমরা করবেনা।
---- ফালতু মানে???
--- হ্যা ফালতুই,,,যদি এসব করো তাহলে আমি সুসাইড করবো।
--- বেশ তো করো,, কিভাবে করবে বিষ খেয়ে নাকি সিলিং প্যানের সাথে শাড়ি পেচিয়ে। বিষ খেতে হলে তোমাকে এখন বাহিরে যেতে হবে বিষ কিনতে তার চেয়ে বরং তুমি শাড়ি পেচিয়ে মরো, আমার থেকে শাড়ি ধার নিতে পারো।
নিতু অবিশ্বাস্য চোখ নিয়ে মায়ের দিকে চেয়ে রইলো।।। তার মায়ের এমন আচরণ তার আর সহ্য হচ্ছে না , সে চলে যাচ্ছে। মায়ার ঘরে একটু যেতে হবে তার ফোন থেকে ফোনে কল দিতে হবে,,, সে বুঝতে পারছেনা এক রাতের মধ্যে ফোন কোথাই যেতে পারে? চোরে নিলো নাতো, চোর অবশ্য তার ফোনেই শুধু দেখলো!
সালেহা বেগম মুচকি হাসতে লাগলো তিনি মেয়েকে ভালো করে চেনেন,, কিছু - কিছু মানুষ আছে জীবনকে অতিমাত্রায় ভালোবাসে, বড়ো- বড়ো বিপদে ও মরে যাওয়ার কথা কল্পনা করতে পারেনা, নিতু সে ধরনের একটি মেয়ে এটা অবশ্য নিতুর একটি ভালো গুন।
চলবে
লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

1 টি মন্তব্য: