ইসলামিক গল্প (নিয়তি) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলামিক গল্প (নিয়তি) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার

#নিয়তি( পর্ব--১৯) লিখা--আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি( পর্ব--১৯) লিখা--আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি( পর্ব--১৯)

লিখা--আসমা আক্তার পিংকি


--- জানেন আমি না ওকে ডিভোর্স করতাম না যদি দেখতাম ও আমাকে সামান্য টুকু ভালোবাসে। কিন্তু ও আমাকে নয় বরং বিয়ের পর ও, এক মেয়ের সাথে রিলেশন চালিয়ে যাচ্ছিলো। বুঝতে পেরেছিলাম আমি মোহন আমাকে ভালোবাসেনা। তাই মুক্ত করে দিলাম, মুক্ত আকাশে ও উড়ে চলে গেলো একবার ও ফিরে তাকালোনা ।
.
.
.
নাজিফা নিশ্চুপ হয়ে যায়, ইমাদের দিকে চেয়ে দেখে ওর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ইমাদ, তাও একটু হেসে, নাজিফার দিকে চেয়ে বলে---- ভালোবাসতে ওকে খুব তাইনা????
----- কেউকে কারো ভালোবাসা পেতে হলে সেই মানুষটাকে অর্জন করতে হয়, ও তো আমাকে কখনোই অর্জন করতে পারেনি তাইতো আমি ও ওকে কখনোই ভালোবাসতে পারিনি, ওকে ছেড়ে চলে আসার সময় হৃদয়ে ব্যাথা অনুভব হয়নি, বুকের বা পাঁজরে কষ্ট লাগেনি, একবার ও পিছুটানে অনুতপ্ত হয়নি। সোডিয়ামের আলোয় কখনো একা হাঁটা হয়নি, সহজে দুঃস্বপ্ন ভেবে মানুষটাকে ভুলে গিয়েছি।
---- তাহলে আমি কেন মিতুকে ভুলতে পারচ্ছিনা ???
---- কারন আপনি তাকে ভালোবাসেন। অন্তরের সবটুকু অনুভূতি দিয়ে আপনি তাকে অর্জন করতে পেরেছেন , তাই মিতুকে আপনি কখনো ভুলতে পারবেন না। আর যেদিন মিতুকে ভুলে যাবেন সেদিন আপনি নিজেই বুঝে নিবেন আপনি ওকে কখনোই ভালোবাসেন নি তাইতো ওর অনুপস্থিতি আপনাকে ওকে ভুলিয়ে দিলো। কিন্তু তাই বলে চলে যাওয়া মানুষটার জন্য জিবন থমকে দেওয়া মানেই আপনি হেরে গেছেন, কিন্তু তাই বলে চলে যাওয়া মানুষটার জন্য অন্য কাউকে ভালোবাসতে না পারা মানে আপনি ভালোবাসার আসল সংজ্ঞায় জানেন না।
.
.
.
ভালোবাসা মানে প্রথম ভালোবাসাকে শ্রদ্ধার সাথে মনে রেখে পুরনো অনুভূতিতে আবার কাউকে ভালোবাসতে পারা ,আবার কেউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা, আবার কাউকে নিয়ে কল্পনায় হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করা , কেননা জিবনে বাঁচতে হলে আপনাকে ভালোবাসতেই হবে , ভালোবাসা নামের চার অক্ষরের শব্দের সাথে জড়িত হতে হবেই।
---- না তা কখনোই আমার পক্ষে সম্ভব নয়, মিতু ছাড়া আমি আর কাউকে ভালোবাসতে পারবো না।
---- ইমাদ সাহেব বাস্তবতা দেখুন, আবেগে নিয়ে আর যাইহোক বাঁচা যায়না।
ইমাদ নাজিফার কথার আর কোনো উওর না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
নিজের একরাশ আবেগ নিয়ে ছাদের উপর চলে যায়, আকাশের দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে রইলো, ওই নিশ্চুপ তারাগুলোর সাথে কথা বলতে লাগলো , কিন্তু ছেলেটি বুঝতে পারছেনা তারা গুলো যে নির্বাক এরা না ওর দুঃখ বুঝবে না ওর কষ্ট।


দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীল আকাশের কোনো এক পাশে মিতুর মুখটা খুঁজতে থাকে । হঠ্যাৎ মনে হলো কেউ একজন আলতো করে হাতটাকে স্পর্শ করছে। তাকাতেই দেখে নওরীন।
---- বাবাই ও বাবাই তুমি এতো রাতে ছাদে কি করছো????
----- তুই এখানে এসেছিস কেন????
---- ওই মে....
----- কি হলো??বল তুই এখানে কেন এসেছিস ???
---- বাবাই ওই মেয়েটি পাঠিয়েছে।
---- এরকুম বলতে হয়না মা, ওনি তো....
--- কি বাবাই, ওনি কি??? আচ্ছা বাবাই আমি ওনি কে কি বলে ডাকবো???
ইমাদ হাটু গেড়ে বসে,,,
---- তোর ইচ্ছে মা, তুই যেটা বলে ডাকবি।
---- বাবাই ওকে আমি মামুনি বলে ডাকি???
ও না আমার মায়ের মতো, বাবাই এই মামুনি টা অনেক ভালো, অনেক সুন্দর একেবারে পরীর মতো, আমাকে আর বোনকে অনেক ভালোবাসে, আর!!!
----- আর কি???
---- আর তোমাকে ও অনেক ভালোবাসে।
ইমাদ সহসা অট্টহেসে উঠলো --- ওনি আমাকে ভালোবাসে, যদি তাই হয়তো তাহলে তো এভাবে চলে যাওয়ার কথাই বলতোনা। যদি তাই হতো তাহলে এভাবে আমায় একা ফেলে যাওয়ার চিন্তাই করতো না।
---- কি হলো বাবাই তুমি কি ভাবছো???
----- না কিছুনা, আসলে তোর মামুনিটা সবাইকে ভালোবাসলে ও আমায় ভালোবাসে না।
নওরীন ধমক দিয়ে,,,,
..(চলবে)..


#নিয়তি পর্ব - ১৮ লিখা--আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি পর্ব - ১৮ লিখা--আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি পর্ব - ১৮

লিখা--আসমা আক্তার পিংকি


বন্ধুর সাথে কথা বলার পর থেকে মনের ভেতরে হাজারও জট পাকতে শুরু করে দিয়েছে ধ্রুবের। কেন জানি তার মনে হচ্ছে রূপা কিছুই করতে পারেনা। অপরদিকে তার বাবা-ভাইয়ের রক্তাক্ত চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠলেই রূপাকেই তাদের খুনী মনে হয়। এ কেমন দ্বীধায় পরে গেল সে? কোনটা সত্য? কোনটা মিথ্যা? কিছু বুঝতে পারছে না ধ্রুব। সবকিছু জট পেকে গেছে। এই বিষয়ে রূপার সাথে কথা বলতেই হবে তাকে।
- ভাইয়া, আমার কিছু টাকা লাগবে এই মুহূর্তে।
নিলুর কথায় চিন্তারাজ্যের বেড়াজাল ছিড়ে বেরিয়ে এল ধ্রুব। বলল,
- কত লাগবে?
হালকা কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিল নিলু। বলল,
- বেশি না ১২ হাজার দিলেই হবে।
চমকে গেল ধ্রুব। বলল,
- এত টাকা দিয়ে কী করবি?
নিলু আমতা আমতা করতে লাগল।
- ও-ওই.... আমি আজ শপিংমলে গিয়েছিলাম। ঘুরেফিরে দেখতে দেখতে একটা এক্সক্লুসিভ ড্রেস দেখে খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু দাম শুনেই কিনতে পারি নাই। তখন আমার কাছে এত টাকাও ছিল না যে কিনব। ভাইয়া ওই জামাটা আমার চাই-ই চাই। খুব সুন্দর ড্রেস-টা।
ধ্রুব বলল,
- তুই ওই মার্কেটের নামটা বল, আমি কালই গিয়ে কিনে আনব।
- না না ভাইয়া। তোর কিনতে হবে না। না... মানে আমি কাল ফ্রেন্ডসদের সাথে কিনতে যাবো বলে ঠিক করে এসেছি। এখন, কাল ওদের সাথে না গেলে রাগ করবে।
- ও। তাহলে তুই-ই গিয়ে কিনে আনিস। এই নে টাকা।
নিলু টাকাগুলো পেয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে গেল। বলল,
- থ্যাংকইউ ভাইয়া।
.
- হ্যালো! টাকা ম্যানেজ করা হয়ে গেছে।
- রিয়েলি? এত টাকা কোথায় পেলে?
- ভাইয়ার থেকে নিয়েছি। বলেছি, আমি একটা ড্রেস কিনব। তাই টাকা লাগবে।
- ও গ্রেড! ইউ আর অ্যা জিনিয়াস নিলু। সত্যিই তোমার কোনো তুলনা হয়না।
- আই নো দ্যাট!
- সরি গো জান। আমার জন্য তোমাকে আজ, তোমার ভাইকে মিথ্যা বলতে হয়েছে। আই অ্যাম রিয়েলি ভেরি সরি। সত্যিই টাকাগুলোর খুব দরকার আমার। কারণ, আমি একটা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। এইটা তো তুমি ভালোভাবেই জানো। মা-বাবার একমাত্র ছেলে আমি। তাদের সবকিছুই আমাকেই দেখতে হয়। আর ১২ হাজার টাকাগুলো তাদের জন্যেই তোমার থেকে নেয়া। এখন আপাতত, অফিস থেকে তেমন টাকা পায় না। ২-৩ হাজার মত পায়। তা দিয়ে আমাদের সংসার-টা টেনে নেয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। বাবাকে হসপিটালে ভর্তি করাতে হবে। ডক্টর বলেছেন বাবার নাকি হার্ট ছিদ্র হয়ে গিয়েছে। যতদ্রুত সম্ভব অপারেশন করাতে হবে। কিন্তু টাকার অভাবে কিছুই করতে পারছি না। ডক্টর বলেছেন, বেশি দেরী হয়ে গেলে বাবাকে আর....
বলেই থামল শরৎ। নিলু বলল,
- কত টাকা লাগবে বলো? আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে তোমাকে হেল্প করার চেষ্টা করব।
শরৎ বলল,
- না নিলু। তুমি আমাকে অনেক হেল্প করেছো। আর না.....
- এবারও হেল্প করার একটা সুযোগ দাও। প্লিজজজজজ, বলো না অপারেশন করতে কত টাকা লাগবে?
শরৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
- দেড় লাখ! ও, তুমি চিন্তা করো না। আমি যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে ফেলব।
নিলু বলল,
- কালই তুমি আংকেলকে হসপিটালে ভর্তি করাবে। আর টাকা নিয়ে একদমই টেনশন করতে হবে না তোমার। সবটা আমি সামলে নেব। তুমি শুধু কালই আংকেলকে হসপিটালে ভর্তি করাবে। ওকে? এখন বাই। খুব ঘুম পাচ্ছে। তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো। গুড নাইট।
শরৎকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কলটা রেখে দিল নিলু। মোবাইল-টা বিছানার উপর ফেলে দিয়ে আলমারির দিকে এগুলো সে। আলমারির উপরেই চাবি রাখা ছিল। সেখান থেকে চাবি-টা পেরে আলমারি-টা খুলে ফেলল নিলু। আলমারির ভিতরের ড্রয়ার-টা খুলতেই গহনা নজরে আসল তার। বাবা মারা যাবার আগেই ভবিষ্যৎ এর কথা চিন্তা করে গহনাগুলো বানিয়ে রেখেছিলেন নিলুর জন্য। মেয়ের বিয়েতে যেন কোনো কমতি না হয়! এটা ভেবেই তিনি নিলুর জন্য সবকিছু করে রেখে গিয়েছেন। গয়নাগুলো আলমারি থেকে বের করে বুকে জড়াল নিলু। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। বাবার শেষ স্মৃতি ছিল এই গহনাগুলো। নিলু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। দূর আকাশের সবথেকে উজ্জ্বল তারার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
- সরি বাবা। আমি তোমার শেষ অবলম্বণটিও নিজের কাছে রাখতে পারলাম না বলে। তবে, আমি জানি বাবা, তুমি আমার উপর রাগ করোনি। তুমি আমার উপর রাগ করতেই পারো না। মনে আছে বাবা? তুমি না আমাকে সবসময় বলতে বিপদেআপদে অসহায়ত্ব মানুষদের পাশে দাঁড়াতে! আমি সেটাই করছি বাবা। বাবা বলো, আমি ঠিক করছি না? হ্যা বাবা, তুমি ঠিক বলেছো। তোমার মেয়ে এখন বুদ্ধিমতী হয়ে গিয়েছে। মাও সবসময় এটাই বলে। জানো বাবা? মা প্রতিদিন রাতেই তোমার কথা মনে করে কাঁদে। সবার সামনে না, যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তখনই মা কাঁদে। বাবা এটা কাউকে বলবে না ওকে? এইটা কিন্তু সিক্রেট।
এইটুকু বলেই থামল নিলু। দেখল, আকাশের সবথেকে উজ্জ্বল তারা-টা চিকমিক করছে। বিস্মিত চোখে তাকাল নিলু। বলল,
- কিহ বাবা! তুমিও মা-কে কাঁদতে দেখেছো?
.
পরের দিন রাতে.....
রাতের আকাশে তারা-রা দল বেধে এদিকওদিক ছোটাছুটি করছে। এই যেন নিকষ কালো আধার আকাশে তাদের মেলা বসেছে। তার মাঝখান দিয়েই উঁকি দিচ্ছে গোলাকার চাঁদ! বাড়িতে থাকাকালীন এমন তারাভরা রাতের উজ্জ্বলিত চাঁদ দেখে দ্বীপকে নিয়ে প্রায়ই এটাসেটা ভাবতে বসতো রূপা। কাল কী পরে দ্বীপের সাথে দেখা করবে? শাড়ি পড়বে নাকি জামা? কী কালারের পড়বে? লাল নাকি নীল? এটাসেটা ভেবেই এক-একটি রাত পেরিয়ে যেত। সবকিছুই যেন ঘোরের মত কাজ করতো। দ্বীপ যে রূপার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হল একটাই? রূপার জন্য দ্বীপের মনে কী আদৌ জায়গা আছে? ছাদের রেলিং ঘেষে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রূপা। চোখ বেয়ে পড়তে আরম্ভ করেছে হাজারও নোনাপানির ঢেউ। এই নিঃসৃত অন্ধকারেও চোখের পানিগুলো চিকচিক করছে তার। রেলিং এর উপরে একটা ডায়েরি রাখা আছে। রূপা ডায়েরি-টা সেখান থেকে তুলে নিল। বুকে জড়িয়ে কিছুক্ষণ কাঁদতে লাগল সে। এই ডায়েরি-টা দ্বীপ জন্মদিন স্বরূপ গিফট দিয়েছিল তাকে। সেদিন থেকেই রূপা ডায়েরি-টা নিজের সাথেই রাখে। যত্নসহকারে যথাস্থানে রেখে দেয় সে। প্রয়োজন ছাড়া বের করে না। আজ কেন জানি ডায়েরি-টার কথা মনে পড়ল। মনটা কাঁচুমাচু করছিল দ্বীপকে নিয়ে কিছু লেখার জন্য। সবাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ধ্রুব এরও একই অবস্থা। তাই দেরী না করে পা টিপে টিপে ছাদে চলে এসেছে সে। ডায়েরির প্রথম পাতায় রাখা ছিল একটি কলম। কলমটাও দ্বীপই দিয়েছে তাকে। ছাদের মাঝখান দিকে একটা দোলনা পাতানো রয়েছে। রূপা সেখানে গিয়েই বসল। রূপা যখনই সময় পেত তখনই দ্বীপের সাথে কাটানো ভালো মুহূর্তগুলো নিয়ে লিখতে বসতো। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। ডায়েরির পাতায় কলম ছুয়ালো সে। লিখল,
“দ্বীপ! এই নামটি যতবার লিখেছি ততবারই আমার বুকের বামপাশে কাঁপুনি দিয়ে উঠেছে। এই নামটি শুধু একটি নামই না। এই নামটি হল ভালোবাসার নাম।”
এইটুকু লিখেই থামল রূপা। এরপর আবারও ডায়েরির পাতায় কলম ছুয়ালো সে।
“জানো দ্বীপ? প্রতিটা রাতেই আমি তোমার জন্য বালিশ ভিজিয়েছি। এমন কোনো রাত যায়নি যে আমি তোমার কথা ভেবে চোখের পানি ফেলিনি। ভাগ্যিস চোখের পানির দ্বিতীয়ত্ব কোনো রং হয়না। নাইলে নির্ঘাত ধ্রুবের সামনে ধরা পরে যেতাম। হ্যা ধ্রুব! উনি আমার স্বামী। আর আমি উনার বিয়ে করা বৈধ স্ত্রী। মুখে তিনবার কবুল বলে, রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করে বিয়ে করেছি উনার সাথে। তিনবার কবুল বলে বিয়ে করে ফেলেছি বলে ভেবে নিওনা যে লোকটাকে আমি মনটাও সপে দিয়েছি। আমি তোমার মত অন্তত বেঈমান নই। হ্যা তুমি বেঈমান। বেঈমান না হলে সেদিন পারতে আমার হাতটা না ধরে পালিয়ে যেতে? কেন করলে এমনটা আমার সাথে? আমি কী দোষ করেছিলাম বলো? কী দোষ করেছিলাম? শুধু ভালোবেসেছিলাম বলে?”
আবারও থেমে গেল রূপা। হাত যেন চলছেই না তার। তবুও কষ্ট করে লেখার চেষ্টা করল,
“সেদিনের কথা মনে পড়ে তোমার? যেদিন আমার জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিল। সেদিনের কথা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে আমার। নতুন মা আমার জন্য একটা ছেলে ঠিক করেছিলেন। ছেলে বললে ভুল হবে। তিন সন্তানের বাবা ছিলেন লোকটা। বয়স ৩৭। লোকটার স্ত্রী তৃতীয় সন্তান জন্ম দেয়ার পরই মারা গিয়েছিলেন। বাচ্চাটার বয়স ছিল তখন ৬ মাস। বাচ্চাটাকে তার ফুফু কিছুদিন মানুষ করেছিল। তার কিছুদিন পরই মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায়। এরপর কিছুদিন ওই লোকটাই বাচ্চাটাকে মানুষ করলেন। কিন্তু তাতেও লাভ হল না। বাচ্চাটা রোজরোজই কাঁদত। আর একটা পুরুষের কাছে বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করা সহজ না। তাই ছেলের মা সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে আবারও বিয়ে দেবেন। তখনি নতুন মায়ের বান্ধুবী মাকে খবর দেন। কারণ মা আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিলেন আমাকে ভ্যান হোক কিংবা রিক্সা চালক, যাকে পাবেন তার সাথেই বিয়ে দিয়ে দেবেন। খবরটা শুনে তো মা কী খুশি। বাবাকে জানালে বাবা প্রথমেই না জানালেন। পরে মায়ের জোড়াজুড়িতে রাজি হতে বাদ্ধ হলেন বাবা। বিয়ের দিনটা চলে আসল। সেদিন জানো? আমার এই অসহায়ত্বের সময় কেউ পাশে ছিলনা। কেউ না। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কী দিয়ে কী করবো? আমার মাথায় শুধু একটা কথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল আমি এই বিয়েটা কিভাবে আটকাবো?”
চোখের বৃষ্টিতে ডায়েরি-টা ভিজে সপসপে হয়ে গিয়েছে। আজ যেন অশ্রুজল গুলো বাঁধ মানছে না রূপার। তারপরও বিনা দ্বিধায় লিখতে লাগল সে। আজ যে মনের কথাগুলো তাকে লিখতেই হবে।
“ঘূর্ণিঝড় হলে যেমন সবকিছু ঘুরতে থাকে তেমনই সেদিন আমার মাথাটা একই ন্যায় ঘুরছিল। সবকিছুই যেন সেদিন শূণ্য লাগছিল। এরপর যখন কাজিনদের মুখে বর এসেছে! বর এসেছে! শুনতে পেলাম তখন যেন মনে হচ্ছিল কেউ আমার আত্মাটাই কেড়ে নিয়েছে। আমার মনে হচ্ছিল এই নরগ থেকে বাঁচার একটাই উপায় সুইসাইড। কিন্তু আমার ভাবনার উপর পানি ঢেলে দিয়ে সেই মুহূর্তে তুমি ফোন দিয়েছিলে। আশ্বাস দিয়েছিলে আমাকে নিয়ে দূর অজানায় পালিয়ে যাবে। সেদিন জানো? তোমার এই একটি কথায় আমার আত্মাটা ফিরে এসেছিল। মনে হচ্ছিল আমার মত ভাগ্যেবান ব্যক্তি এই পৃথিবীতে আর দুটো নেই। সেদিন তোমার কথায় আমি লোকভর্তি ঘরের ভিতর দিয়েই পালিয়ে গিয়েছিলাম। তখন আমার সবকিছুই যেন ঘোর ঘোর লাগছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি তোমাকে পেতে চলেছি। কিন্তু যখন গিয়ে দেখলাম তুমি রাস্তার আশেপাশেও নেই, তখন মনের ভেতরে ভয় জাগতে শুরু করল। ভাবলাম এই বুঝি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি। হলো সেটাই। কিন্তু আমি তখনও দমে যায়নি। ঠ্যায় হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম তোমার জন্য। খানিকক্ষণ পর যখন জানতে পাররলাম আমাকে সবাই খুঁজাখুঁজি করছে। তখন আর দাঁড়াতে পারলাম না। নিজের সবটুকু বল দিয়ে ছুটতে লাগলাম। কোথায় যাচ্ছি? কোথায় থাকবো? তখন কিছুই মাথায় আসছিল না আমার। আমি শুধু একটা কথায় ভাবছিলাম আমাকে পালাতে হবে দ্বীপের জন্য হলেও আমাকে পালাতে হবে। সেদিন জানো? আমি আর দৌড়াতে পারিনি। মাঝরাস্তায় এসে হোচট খেয়ে নিচে পড়ে যায়। আরেকটু হলেই এক্সিডেন্ট করতাম তার আগেই রিহান, তোমার ছোট ভাই আমাকে বাঁচিয়ে নেয়। এরপর সে আমাকে আমার বান্ধুবি ত্রিশাদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়। রিহানের প্রতি আমি খুবই কৃতজ্ঞ। ও আমাকে কম হেল্প করেনি। ছেলেটার সাথে তারপর থেকে আর দেখাও হয়নি। তোমরা দুই ভাই-ই বোধয় এসাথেই হারিয়ে গিয়েছো। যাইহোক, এরপর আমি ত্রিশাদের বাসায় কাটিয়ে দিলাম। ওইদিকে আমাকে নতুন মা খুঁজতে খুঁজতে শেষমেশ ত্রিশাদের বাসায়-ই পেয়ে যায়। তারপর থেকেই শুরু হয় অত্যাচার। আমাকে ঘরে বন্ধি করে রাখা হলো। পচা পান্তাভাতও খেতে দেয়া হত। সব অত্যাচার অতিক্রম করার পর আবারও বিয়ে ঠিক হল আমার। কিন্তু বিশ্বাস করো, এই বিয়েটা আটকানোর কোনো উপায় ছিলনা আমার কাছে। আমাকে জোরপূর্বক বিয়েটা দিয়েছিলেন নতুন মা। এরপরও আমি দমে যায়নি। পালাবার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছি কিন্তু সফল হতে পারিনি। এখানেও নতুন মায়ের মত আচরণ করতে লাগল ধ্রুব। কোনো না কোনো কারণে মারতে আরম্ভ করল সে। তখন এসব আর সহ্য হতো না। তাই বরাবরই পালাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু এবারও ধরা পড়ে গেলাম ধ্রুবের হাতে। এরপর থেকে আর কখনও পালাবার চেষ্টা করিনি। কোথায় গিয়ে থাকবো আমি? আমার যে থাকার মত কোনে জায়গা নেই। বাবার বাড়ি? কিন্তু আমার বাবা তো এখন আর আমার বাবা নেই। সে তো নতুন মায়ের কথমত চলে। আর নতুন মা তো আমাকে ওই বাড়িতে এক পা ও রাখতে দেবে না। থাকা তো দূরে থাক। আমার এখন থাকার জায়গা এইটাই। তবে, তুমি যতদিন না আমার কাছে ফিরে আসবে, ঠিক ততদিন আমি আজীবন তোমার জন্য এভাবে অপেক্ষা করবো। আমার ভালোবাসার উপর পুরো বিশ্বাস আছে। আমি জানি, তমি ফিরে আসবে। খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।”
এতটুকুই লিখে কলম-টা ডায়েরির প্রথম পাতায় রেখে বন্ধ করল রূপা। নিখুঁতভাবে দূর আকাশের দিকে চোখ মেলে তাকাল সে। আজ পূর্ণিমারচাঁদ। হাজারও তারার মাঝে উজ্জ্বলিত চাঁদের দিকে তাকাতেই দ্বীপের হাঁসিমাখা মুখখানি দেখতে পেল সে। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণায় হাঁসির রেখা ফুঁটে উঠল রূপার।
চলবে
(অসুস্থতার কারণে এ'কদিন গল্প দিতে পারিনি। এখন ঘড়িতে 6:26 AM বাজে। এইমাত্র গল্পটা লিখে শেষ করলাম। আর এতদিন গল্প-টা না দেয়ার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।
আর যাদের কাছে আমার গল্পগুলো স্টার জলসার সিরিয়ালের মত মনে হয়, তারা দয়া করে আমার গল্প হতে বিরত থাকুন। ধন্যবাদ।)
#নিয়তি পর্ব - (১৬+১৭)  লিখা--আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি পর্ব - (১৬+১৭) লিখা--আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি
পর্ব - ১৬+১৭

লিখা--আসমা আক্তার পিংকি


সিড়ি বেয়ে রূপা বসার রুমে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল নিলু তাড়াহুড়ো করে সদর দরজার দিকে এগুচ্ছে। রূপার বেশ খটকা লাগল। এই মেয়েটা রোজ রোজ কার সাথে দেখা করতে যায়? এতদিন রূপা এরিয়ে গেলেও, আজ কোনমতে এড়ানো যাবে না। নিলুর সঙ্গে এই প্রসঙ্গে কথা তাকে বলতেই হবে। মেয়েটা কার চক্কোরে পড়েছে এটা তাকে জানতে হবে। এমনিতে আজকালকের ছেলেদের উপর ভরসা নেই। কখন কী করে বসে?
- নিলুউউউউউউ!
আচমকা রূপার ডাকে দাড়িয়ে গেল নিলু। পিছন ঘুরে বলল,
- হ্যা ভাবি, কিছু বলবে?
- কোথায় যাচ্ছো?
- ফ্রেন্ডদের সাথে শপিং করতে যাচ্ছি ভাবি।
- সন্ধ্যার সময় কিসের শপিং! মাকে কী বলেছ?
- না... হ্যা মানে...
- দেখ নিলু, আমাকে মিথ্যা বলতে হবে না। আমি জানি তুমি শপিং করতে যাচ্ছো না। তোমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাচ্ছো। আমি ঠিক ধরেছি না?
চমকে গেল নিলু। ভাবি কিভাবে জানল?
- ন-না ভাবি। তুমি ভুল বুঝছো।
- উঁহু... আমি ঠিকই বুঝেছি। দেখ নিলু আমি তোমার ভাবি, আমার সাথে তো শেয়ার করতেই পারো না তাই না?
- না আসলে হ্যা.... হ্যা ভাবি তুমি ঠিক ধরেছ, আসলে আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। তুমি প্লিজ মাকে বলো না। মা জানতে পারলে আমাকে মেরেই ফেলবে।
- আচ্ছা বলব না। তবে একটা শর্ত আছে।
- কি শর্ত?
- এই ভর সন্ধ্যার সময় তুমি বাইরে যেতে পারবে না। আজকালকার দিন কাল ভাল না। আর সেই ছেলেটাও ভাল কিনা, তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভাল হলে অন্তত তোমাকে এই সন্ধ্যার সময় দেখা করার কথা বলতো না।
- ভাবি, তুমি তাকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। সে খুব ভাল ছেলে। আর আমাকে খুব রেসপেক্টও করে সে।
- রেসপেক্ট করে তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু ওই ছেলেটা তোমার সাথে কিছু করবে না তার গ্যারান্টি কী? আজ না হয় তোমাকে সে রেসপেক্ট করে। কিন্তু এই রেসপেক্টটা কতদিনের থাকবে? আজ, কাল, না হয় পরশু। তারপর....
- ভাবি তুমি ওকে ভুল বুঝছ, ও খুব ভাল ছেলে।
- নাম কী ছেলেটার?
- শরৎ।
- কোথায় থাকে?
- রাজশাহী।
অবাক হল রূপা। বলল,
- রাজশাহী! এত দূর থেকে ঢাকায় এসে ছেলেটা তোমার সাথে দেখা করে?
- না, না। ও তো ঢাকাতেই থাকে। আর রাজশাহীতে ওদের নিজেস্ব বাড়ি। সেখানে ওর মা-বাবারা থাকেন।
- ও।
- ভাবি এবার তো যেতে দাও। আমি না গেলে ও রাগ করবে।
- নিলুউ! আমি কী বলেছি তুমি শুনো নাই?
- ভাবি ২০ মিনিটেরই তো ব্যাপার। আমি ওর সাথে জাস্ট দেখা করেই চলে আসব। তুমি প্লিজ বাধা দিওনা।
- তুমি মনে হয় আমার কথা শুনতে পাও নাই। আমি বলেছি না, এখন দেখা করা যাবে না। তাছাড়া এখন বাইরে রাত নেমে গেছে। একাএকা বাইরে বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। ঘরে যাও বলছি। কাল দেখা করো।
- ভাবিই! প্লিজ.....
রূপা ধমকের সুরে বলল,
- নিলু, কি বলেছি বুঝো নাই? আমাকে কী এখন মাকে ডাকতে হবে?
বিরক্ত হল নিলু। বলল,
- ওকে যাচ্ছি না। হ্যাপি?
.
- রূপা মা, এই কফিটা ধ্রুবকে দিয়ে আয়। ছেলেটার খুব শখ করেছে আমার হাতের কফি খেতে।
- আপনি কষ্ট করে বানাতে গেলেন কেন মা? আমাকে তো অন্তত ডাকতে পারতেন। আমি বানিয়ে দিতাম।
ফারজানা মুচকি হাসলেন। বললেন,
- আরে সমস্যা নাই। ছেলেটা আমার কাছে অনেক দিন পর একটা আবদার করেছিল। আমি কী সেটা ফেলে দিতে পারি নাকি?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও বললেন,
- এখন দেরী করিস না মা। কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেলে ও রাগ করবে। তাড়াতাড়ি যা।
- জ্বি।
রূপা সিড়ি বেয়ে ধ্রুবের ঘরের দিকে গেল। ঘরে গিয়ে দেখতে পেল, ধ্রুব নেই। বোধয় বাথরুমে গেছে। রূপা কফির মগ টেবিলের উপর রেখে দিয়ে চলে এল বসার ঘরে। কিছুক্ষণ পর উপর থেকে ধ্রুবের গলার স্বর ভেসে এল। ধ্রুব তার ঘর থেকে মা-মা বলে ডেকেই যাচ্ছে। একপর্যায়ে ধ্রুবের চিল্লাচিল্লিতে সবাই বসার ঘরে জড় হল।
- মা, ভাইয়ার কি হয়েছে? এমন চেঁচামেচি করছে কেন?
- কী জানি! রূপা তুই কি কিছু জানিস?
- না, মা। আমি তো একটু আগেই উনার রুমে গিয়েছিলাম। উনি রুমে ছিল না। হয়তো বাথরুমে ছিল। তাই উনাকে না পেয়ে আমি কফির মগটা টেবিলের উপর রেখে এসেছিলাম। আর তাছাড়া ঘরের ভিতরের সবকিছুই তো ঠিক ছিল। তাহলে....
- আচ্ছা, আমি গিয়ে দেখছি, কি হয়েছে?
ফারজানা উপরে চলে গেলেন। তার সাথে রূপা-নিলুও গেল। ধ্রুবকে ডেকে ফারজানা বললেন,
- কি হয়েছে বাবা? এমনভাবে ডাকছিস কেন?
- মা, এখানে কফি রেখেছে কে?
- কেন কি হয়েছে?
- টেবিলের উপরে আমার কিছু ইম্পরট্যান্ট ফাইল রেখে বাথরুমে হাতমুখ ধুতে গিয়েছিলাম। বাইরে এসেই দেখি ফাইলের উপরে কফি পরে ভিজে সপসপে হয়ে গিয়েছে। আমি দিনরাত এক করে এই ফাইল-টা তৈরি করেছি।
সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। অপরদিকে রূপা ভয়ে চুপসে গেছে একেবারে। কফিটা ফাইলের উপর কিভাবে পড়ল? সে তো ঠিকভাবে রেখে গিয়েছিল। তাহলে? রূপা দেখল, টেবিলের উপর ধ্রুবের যে ছবিটা রাখা ছিল সেটা উবুড় হয়ে পড়ে আছে। তার মানে ছবিটা কফির মগের উপর পড়ে গিয়েছিল। তারপর....
রূপা কাঁপা কাঁপা সুরে বলল,
- আ.....
ফারজানা রূপাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন,
- আমিই রেখে গিয়েছিলাম। সরি রে বাবা। আমি বুঝতে পারি নাই।
রূপা ফারজানার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। ফারজানা দু চোখের পাতা বন্ধ করে রূপাকে চুপ থাকতে বললেন। ধ্রুব তার রাগ সঞ্চয় করে বলল,
- তুমি সরি বলছো কেন মা? দোষটা তো আমারই। ফাইলটা আমার ওইখানে রাখা উচিত ছিল না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও বলল,
- সরি মা। আমার সামান্য ইস্যু নিয়ে এমন রিয়াক্ট করা ঠিক হয় নাই। আসলে মাথাটা তখন গরম ছিল। এজন্য.... এগেইন সরি মা।
.
বালিশ নেবার জন্য বিছানার দিকে হাত বাড়াল রূপা। তৎখানিক ধ্রুব ওর হাতটা খপ ধরে ফেলল। হাতটা আরো শক্ত করে ধরল সে। বলল,
- কফির মগটা তুমিই ওইখানে জেনেশুনে রেখেছিলে না? যাতে আমার কষ্টের ফল নষ্ট হয়ে যায়। রাইট?
রূপা অবাক হল। ধ্রুব বলল,
- আই নো দ্যাট। মা, তখন তোমাকে বাঁচানোর জন্যেই সব দোষ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে নিয়েছিল। বাহ! বাহ! তুমি দেখছি, আমার মাকে নিজের বশে নিয়ে ফেলেছো। তোমার কথায় তো দেখছি তিনি ওঠেন, বসেন এবং সবকিছুই করেন।
খানিকক্ষণ চুপ থেকে আবারও বলল,
- দেখ রূপা, আমি তোমাকে ফাস্ট এন্ড লাস্ট ওয়ানিং দিচ্ছি... আমার মা-বোন দুজনের থেকে দূরে দূরে থাকবে। তারা যেন তোমার ছায়াও না পায়।
রূপা বরাবরই অবাক হল। কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করল না। রূপা গম্ভীর সুরে বলল,
- সরি! বাট আমি এটা পারব না।
- কি বললে তুমি? আমার মুখের উপর তর্ক? ধ্রুব মাহমুদের উপর তর্ক?
বলেই রূপাকে মারতে যাচ্ছিল ধ্রুব। কিন্তু কোন এক কারণে মারতে পারল না সে। রূপা বলল,
- থামলেন কেন? মারুন! কি হলো মারুন না! একটা কাজ করেন। একেবারের জন্যেই আমাকে মেরে ফেলুন। আমি আর পারছি না। সত্যিই আমি আর পারছি না।
ধ্রুব কিছু বলল না। লাইট-টা অফ করে দিয়ে বিছানায় শরীর মেলিয়ে দিল। একটি বারের জন্যও রূপার দিকে তাকাল না ধ্রুব। তাকালে হয়তো ধ্রুবের চোখের পানিটা দেখে ফেলত সে।
.
দিন গড়াচ্ছে, মাস গড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে রূপার প্রতি আবারও মায়া জন্ম নিয়েছে ধ্রুবের মনে। আর পারছে না সে রূপাকে কষ্ট দিতে। মেয়েটাকে কষ্ট দিতে গেলেই ওর বুকটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। কিন্তু কেন এমনটা হয়? রূপার প্রতি আবারও কেন দূর্বল হয়ে পড়েছে সে? আর ভাবতে পারছে না ধ্রুব। মাথাটা পুরো ফাকা। চারিদিক যেন তার মারবেলের মত ঘুরছে। আজও রূপাকে মারতে গিয়েছিল সে। কিন্তু কোনো এক বাধায় মারতে পারেনি সে। কিন্তু কেন মারতে পারেনি সে? কেন ওকে প্রতিবার মারবার সময় তার বুকে ব্যাথা অনুভব হয়? কেন রূপার নিষ্পাপ মুখখানি দেখলে তার সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যায়? কেন মেয়েটাকে দেখলে তার হৃদস্পন্দন তেজ গতিতে বেড়ে যায়? এগুলোকে কি নাম দেবে সে? ভালোবাসা! নাকি....
হঠাৎ কল এল সেই চেনাপরিচিত নাম্বার থেকে। ধ্রুব কলটা রিসিভ করতেই অপাশ থেকে বলে উঠলে,
- কি খবর দোস্ত? কোনো খোজ-খবর নেই তোর! কোথায় থাকিস?
- (নিশ্চুপ)
- কি রে চুপ কেন? এক মাস হতে চলল তোর সাথে কোন যোগাযোগ নেই আমার। এত সহজে ভুলে গেলি আমাকে?
- ভুলি নাই রে। ভীষণ দ্বীধার ভিতরে আছি আমি। কী করবো না করবো কিছুই মাথায় আসছে না আমার।
- কেন কি হয়েছে? কিসের এত দ্বিধা তোর?
ধ্রুব চুপ হয়ে গেল। ওকে কী এটা বলা ঠিক হবে?
- হ্যালো!! লাইনে আছিস?
- হু।
- আবেএএএ! চুপ কেন? বল আমায় কি হয়েছে?
ধ্রুব অস্ফুট সুরে বলল,
- রূপা......
- রূপা কী? ও কী আবার তোর অত্যাচারের ঠ্যালায় মরে-টরে গেল নাকি?
তেড়ে গেল ধ্রুব। বলল,
- ফালতু কথা বলিস কেন?
- আরেব্বাস! ফালতু কথার কী বললাম?
- দেখ আমি এখন ফান করার মুডে নেই। রাখি।
- আরে না না। সরি সরি... আমি আর ফান করছি না। এবার বল কি হয়েছে?
- আসলে.....
- কী বল?
- আ-আমি....
- আরে তুতলাচ্ছিস কেন? যা বলবি বিনা দ্বীধায় বল।
- আসলে আমি আবারও রূপার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছি। ও আমার চোখে হারা হলেই আমি পাগল হয়ে যায়। ওকে ছাড়া একমুহূর্তের জন্যও থাকতে পারিনা। এই এক মাসেই আমি ওকে বহুত কষ্ট দেবার জন্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো এক মায়ার টানে সফল হতে পারি নাই। আসলে কী জানিস? আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি। এজন্য.....
ঘর কাঁপিয়ে হেসে দিল সে। বলল,
- আমি জানতাম, তুই এমন কিছুই বলবি। তবে তোর থেকে আমি এটা আশা করি নাই।
- তুই আমার কথাটা বোধয় বুঝতে পারিস নাই। আমি রূপাকে.....
- আমি ঠিকই বুঝেছি। আমাকে আর নতুন করে বুঝাতে আসতে হবে না। নতুন করে বুঝতে হলে তোকে বুঝতে হবে। আমি তোকে আগেই বলেছিলাম, মেয়েটা সুবিধার না। তোকে সে তার মায়ার জালে ফাঁসিয়ে নেবে। নিলো তো! আমার কথা বিশ্বাস হল এবার?
- তুই ভুল বুঝছিস। আমার কথাটা আগে একটা বার শোন। আমরা যেমন ভাবছি মেয়েটা তেমন না। আমার কী মনে হয় জানিস? আমাদের কোথাও ভুল হয়েছে। আমার মনে হয় না ও এমন বড় কিছু করতে পারবে। এতদিন ধরে ওর সাথে থেকে এসেছি। কখনও ওর চোখে খারাপ কিছু বাঁধেনি আমার। সবথেকে বড় কথা, মেয়েটা খুব ধর্য্যশীল। আমি ওর উপর কম অত্যাচার চালায় নাই। তারপরও মেয়েটা কখনও উফ পর্যন্ত করে নাই। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে নিষ্পাপ মেয়েটার সাথে আমরা নিজের অজান্তে হলেও অন্যায় করেছি। আর....
- বাহ ধ্রুব। বাহ! এতটা চেঞ্জিং? ওই মেয়েটার ফান্দে পড়ে তুই সবকিছুই কী ভুলে গেলি? কিছুই কী তোর মনে নাই? কিভাবে ভুলে গেলি সব? ও তোর ছোট ভাইকে এক্সিডেন্ট করিয়ে মেরে ফেলেছিল। তারপরও কিভাবে বলিস আমাদের কোথাও ভুল হয়েছে। আর কী বললি তুই? রূপা নিষ্পাপ! হায়রে আল্লাহ! ওকে যদি নিষ্পাপ বলিস তাহলে তো দুনিয়াতে যারা নিষ্পাপ আছে তারা তো এই কথা শুনলে গর্তে গিয়ে লুকাবে। আর তোর কী আমার কথা বিলিভ হয় না? তুই না আমাকে ভাই ভাবিস? তাহলে আজ কিভাবে বললি মেয়েটাকে চিনতে ভুল হয়েছে আমাদের। সেদিনের দৃশ্য এখনও আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। সেদিন তোর ভাই, আমার সাথে কথা বলে গাড়িতে উঠেছিল। আমি ওকে বিদায় দিয়ে অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম। কী মনে করে যেন থমকে গেলাম। পিছন ঘুরে দেখতে পেলাম, ও কার সাথে যেন কথা বলছে। কিন্তু কার সাথে বলছে তা বুঝা যাচ্ছিল না। এরপর আমি বুঝার জন্য দু কদম পা বাড়ালাম। স্পষ্ট দেখতে পায় সে একটা মেয়ের সাথে কথা বলছে। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল, ওরা কোনো একটা কারণে ঝগড়া করছে। কিছুক্ষণ পর মেয়েটা চলে যায়। তোর ভাইও গাড়িতে উঠে বসে। পাশে আংকেলও ছিলেন। গাড়ি স্টার্ট দিলেই আমি অফিসের ভিতরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর আমার একটা ম্যানেজার এসে বলে, অফিসের সামনে নাকি বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। আমি দেরী না করে সেখানে ছুটে চলে যায়। গিয়েই দেখতে পায় আংকেলের রক্তাক্ত চেহারা। উনার পুরো শরীর রক্তে মেখে গিয়েছিল। চেনার কোনো চান্সই ছিল না। আর অপরদিকে তোর ভাইয়ের অবস্থা ছিল করুণ। শ্বাস চলছিল, কিন্তু নড়তে পারছিল না। আমি প্রথমেই ওর কাছে ছুটে যায়। ওকে ধরে বলি, 'এক্সিডেন্টটা কিভাবে হল?' ও জড়ালো কন্ঠে বলেছিল, 'এটা এক্সিডেন্ট না ভাইয়া, জেনেশুনে প্লান করানো হয়েছে।' আমি বললাম, 'কে করিয়েছে?' ও বলেছিল, 'রূপা... ওই মেয়েটাকে কখনও ছেড়ে দিবেন না ভাইয়া। ও আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে। আমি চাইনা, আমার মত হতভাগী আর দ্বিতীয়জন না হয়। আর এই এক্সিডেন্টটাও রূপা'ই করিয়েছে।' আমি বলেছিলাম, 'একটু আগে যে মেয়েটার সাথে কথা বলছিলি সেই মেয়ে? উত্তরে ও, 'হ্যা' বলেছিল। আমি একেএকে সবকিছু জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। সবকিছু শুনে আমি জানতে পারলাম মেয়েটা নাকি বড়লোক ছেলেদের সাথে রিলেশন করে টাকা খায়। আর সেদিনও তোর ছোট ভাইয়ের কাছে সে টাকা চাইতে এসেছিল। সেদিন ও 'টাকা নেই' বলেছিল বলে, আজ তোর ভাই আর এই পৃথিবীতে নেই। সাথে তোর বাবাকেও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হল ওই মেয়েটার জন্য। সেদিন খুব চেষ্টা করেছিলাম ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য কিন্তু আমি বাঁচাতে পারিনি। পারিনি ওকে পৃথিবীর আলো দেখাতে। সেদিন মনে খুব ক্ষোভ জন্মেছিল ওই মেয়েটার জন্য। পুরো ঢাকাশহরে খোঁজ লাগিয়েছিলাম ওকে খুঁজবার জন্য। দেরী করে হলেও সহজে আমরা মেয়েটার সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলাম। কারণ মেয়েটাকে সবাই চিনতো। ঢাকার কোনো ছেলে বাকি ছিল না যে ওকে চেনে না। সবাই ওকে চিনতো। খুব সহজে পেয়েও গেলাম তারপরই তো তুই জানিয়ে দিলি, ওকে বিয়ে করবি। ওর জীবনটা নষ্ট করে দিবি। আমি ভেবেছিলাম তুই আবেগে এসে কথাগুলো বলছিস। কিন্তু কে জানে, তুই ওকে সত্যি সত্যি বিয়ে করে ফেলবি?
এইটুকুই বলে থামল সে। কিছুক্ষণ পর আবারও বলতে লাগল,
- শোন ধ্রুব, রূপা তোর টাইপের মেয়ে না। ও একটা খুনী। ভুলে যাবি না ও আগে থেকে ট্রাক ঠিক করেছিল তোর ভাইকে মারবার জন্য। সেদিন ও সবকিছু প্লান করে এসেছিল তোর ভাইকে মেরে ফেলবার জন্য। কিন্তু কী হল? তোর ভাইয়ের সাথে বাবাকেও মেরে ফেলল। আর একটা কথা মনে রাখবি খুনী কখনও কারো আপন হয় না। খুনী সবসময় খুনীই হয়। তুই-ই ভেবে দেখ, ওকে এতবার মারবার পরেও কিছু বলছে না কেন? অবশ্য তুই কিভাবে বুঝবি? তোর চোখে তো রূপা মহৎ-মহান।
- (নিশ্চুপ)
- ও জানিস, এসব কেন চুপচাপ সহ্য করছে? তোর ধন-সম্পত্তি এবং টাকার লোভে।
চলবে

#নিয়তি ( পর্ব--১৫) লিখা- আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি ( পর্ব--১৫) লিখা- আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি ( পর্ব--১৫)
লিখা- আসমা আক্তার পিংকি

.
.
লাল- গোল্ডেন পর্দার ছোট- ছোট ফাঁক দিয়ে, ভোরের অর্ক যখন রৌদ্রের মেলা বসিয়েছে, ঠিক তখনি তার সামান্য তম স্পর্শে ইমাদের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ কচলাতে- কচলাতে উঠতেই কি যেনো একটা মনে করে ছেলেটির মুখটা ভারী হয়ে যায়। বিছানার ওপাশে তাকিয়ে একটু মলিন হেসে বলে উঠলে--- মেয়েটি আজ পাশে নেই তাই ফজরের নামাজটা ও পড়তে কেউ আজ আমায় ডাকলোনা। ছেলেটির মনের ভিতর একটা শূন্যতা কাজ করতে লাগলো। ইমাদ বুঝতে পারছেনা তার মন কি চায়।। আসলে আমার এমন কেন লাগছে? আমি কি চাচ্ছি,,, আমার কি করা উচিত আমি কেন বুঝতে পারছিনা। ছেলেটি উপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো--- প্লিজ আল্লাহ আমাকে এরকুম দোটানায় রেখো না। আমার কেন নাজিফার জন্য ও কষ্ট হয়। কেন ওর জন্য চোখ জল টপটপ করে। ছেলেটি মাথায় হাত দিয়ে চিৎ হয়ে অনেকক্ষন শুয়ে থাকে। হঠ্যাৎ কি মনে করে বিছানার ডান দিকের টেবিলের দিকে চোখ পড়তেই একটি চিঠি পেলো,,,, আচমকা চিঠিটা হাতে নিতেই ছেলেটির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়।। বুকের বা পাশে হাহাকার শব্দের আনাগোনা হতে লাগলো। চিঠিটা খুলতেই তার ভিতরে লিখা---- তুমি অনেক ভালো থেকো, এন্ড প্লিজ নিজের খেয়াল রেখো।
.
.
ইমাদ দুই লাইনের এই চিঠি টা পড়ে, থরথর করে কাঁপতে লাগলো,, বাহিরের দিকে চেয়ে দেখে আকাশটা হঠ্যাৎ মেঘে ছেয়ে গেছে, আর ইমাদের চোখ দুটো ও জলে ঝাপসা হয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠে সোজা গেস্ট রুমে চলে যায় গিয়ে দেখে সেখানেও নাজিফা নেই। শুধু বিছানার উপরএকটি লাল খাম। ইমাদ তা হাতে নিয়ে খুলতেই দেখে তা তে লিখা----- চলে যাচ্ছি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আসলে আমারেই বুঝা উচিত ছিলো আমি তোমার ভালোবাসার যোগ্য নয়, আর ভালোবাসা চার অক্ষরের এই শব্দটি সবার কপালে জুটেনা। আমি হয়তো আনলাকি ব্যক্তি তাই এ জীবনে আর কারো ভালোবাসা পেলাম না কিন্তু তাতে কি আল্লাহর তো ভালোবাসা পেয়েছি, নিজে তো তোমার মতো একজন মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছি এটাই আমার কাছে অনেক বড়। আর হ্যা শুনো ঠিক মতো খাওয়া - দাওয়া করবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে আর পারলে মাঝেমধ্যে প্রাণ খুলে হাসবে জীবনটাকে সহজ ভাবে ভাববার চেষ্টা করবে, তাহলে দেখবে সবকিছুই তোমার কাছে সহজ লাগবে।
আর আমি তোমায় ভালোবাসি, এই বাক্যটার গভীরতা আমি তোমার থেকে বুঝতে পেরেছি। সত্যি আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভালোবাসবো আর ভালোবেসে যাবো।
আল্লাহ হাফেজ..............
.
.
মানে কি শুধু তুমি ভালোবাসো এই কথাটি বলে চলে গেলে অথচ আমাকে বলার সামান্য তম সুযোগ দিলেনা। আমাকে একটু বুঝতে পারলে না। না আমি তোমাকে যেতে দিবোনা। ইমাদ চিঠি টা রেখে চোখের জল মুছতে- মুছতে নিচে এসে দেখে বাড়ির সবাই বিষন্ন মুখে বসে আছে।
.
.
ইমাদ ------ মা নাজিফা কোথায়???
সালেহা গম্ভীরমুখে বসে রইলেন, ইমাদের প্রশ্নের কোনো উওর দিলেন না।
--- কি ব্যাপার মা কথা বলছো না কেন?
সালেহা চেঁচিয়ে - চেঁচিয়ে, ----- কি বলবো হ্যা তুই চেয়েছিস ও যেনো চলে যায় তাই চলে গেছে আবার কি???? আবার কেন ওর খোঁজ নিচ্ছিস??
-
ইমাদ কাঁদো স্বরে --- মা প্লিজ এভাবে বলোনা, ওর সাথে যে আমার অনেক কথা আছে।
--- কি কথা থাকতে পারে আর?
ইমাদ কিছুটা রেগে---মা ওকে আমি......
--- কি? কি তুই ওকে?
--- মা প্লিজ সময় নষ্ট করোনা বলো ও কোথায়?
--- নাজিফা ওর মায়ের কাছে চলে গেছে চিরকালের জন্য ।
..
ইমাদ অবাক হয়ে গেলো --- মা কি বলছো তুমি?
,---- আমি ঠিকেই বলছি ১০.৩০ টার ট্রেনে ও গ্রামে যাবে।
নাবা ইমাদের কাছে গিয়ে আলতো করে ওর হাতটা ধরে কাঁদো স্বরে বললো----- বাবা মামুনি তলে গেলো।
ইমাদ হাঁটু গেড়ে বসে, নাবার কপালে চুমু দিয়ে ---- না মা তোমার মামুনি কোথা ও যাবেনা। আমি তাকে ফিরিয়ে আনবোই।
৷ নওরিন ইমাদের কাছে এসে---- বাবাই প্লিজ তুমি মামুনি কে নিয়ে আসো, প্লিজ বাবাই।।।
.
.
.
ইমাদ চোখের জল গুলোকে মুছে হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো মাএ ৯ টা বাজে। ছেলেটির মনে একটু আশার সঞ্চার হলো --- না এখন ও ট্রেন আসেনি আমি এখন ওকে স্টেশনে গেলে নিশ্চয় পাবো ও আমাকে এভাবে একা করে যেতে পারেনা।
.
.
ইমাদ বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে, লাল- নীল সবুজ বাতির এই শহরের, ব্যস্ততা আর জ্যাম, ও দূষণ পরিবেশকে উপেক্ষা করে ইমাদ চলতে লাগলো নাজিফার খোঁজে। মাঝেমাঝে শরতের আকাশ থেকে সামান্য তম বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে এই ভেবে যে যদি ওকে খুঁজে না পাই , যদি ও চলে যায়। তাহলে তো সারাজীবন ও আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবোনা।
.
.
সিএনজি টা যখন কমলাপুর রেল স্টেশনের সামনে এসে থামলো, ড্রাইভার তখন ইমাদের দিকে তাকিয়ে --- স্যার ও স্যার কি হলো নামবেন না?
ইমাদ তার ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে, ---- অ্যা ও হ্যা চলে এসেছি।
এই বলে ইমাদ সিএনজি থেকে নেমে এক দৌড় দিলো।
ড্রাইভার ভ্রু কুঁচকে ----আরে স্যার ভাড়া না দিয়ে চলে যাচ্ছেন কেন????
ইমাদ বিরক্তিকর ভাব নিয়ে আবার পিছু ফিরে আসলো ড্রাইভারে হাতে টাকা দিয়ে,,,, আবার দৌড় দিতেই,,,
ড্রাইভার ভ্যাবাচ্যাকা চোখে --- স্যার টাকা ফেরত নিবেন না।
ইমাদ দৌড় দিতে- দিতে--- ওটা তুমি রেখে দেও আর দোয়া করো তার বদলে যেনো আমার বউটা চলে না যায়।
--- ও এখন বুঝলাম ব্যাপারটা। স্যার যেতে দিন অসুবিধা নেই আরেকটা করে ফেলেন পরে।
ইমাদ চেঁচিয়ে - চেঁচিয়ে,----- ভাই তোমার গেলে তুমি বুঝতা এখন তো আমার গেছে তাই মজা নিচ্ছো। এটাই হচ্ছে বাঙালির স্বভাব।
.
.
ইমাদ স্টেশনের কাছে যেতেই দেখলো ট্রেন চলে যাচ্ছে ইমাদ তাড়াতাড়ি ট্রেনটির পিছনে দৌড়াতে- দৌড়াতে --- এই থামো ।
জানালা দিযে একজন প্রবীন লোক মাথা বের করে --- কি হয়েছে বাবা তোমার?
ইমাদ হাঁপাতে হাঁপাতে --- আরে দাদু আমার বউ চলে যাচ্ছে....
লোকটি একটু হেসে---- তো যেতে দাওনা, আরামে কয়েকদিন ঘুমাও, তারপর ফিরে আসবে তো যাও বাড়ি যাও।তোমার দিদা ও এমন ছিলো আর আমি ও তোমার মতো পাগল ছিলাম।
ইমাদ ভ্রু কুঁচকে --- দাদু দোহাই লাগে ট্রেন থামাতে বলেন আরে আমার বউ অভিমান করে আমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
৷ কথাটি বলতে- বলতে ইমাদ নিচে পড়ে যায় আর ট্রেনের পিছু ছুটতে পারলোনা। প্রবীন লোকটা একরাশ হাসি নিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে বললো--দাদুভাই প্রেমের মরা জলে ডোবে না।।।। হা,হা, চালিয়ে যাও।
.
.
ইমাদ কিছুটা রেগে---- আমি মরছি আমার জ্বালায় আর এনি..... কিন্তু নাজিফা তো চলে গেলো,,,, ও কি সত্যিই আর আসবেনা। এই ভাবতেই ইমাদের চোখ জলে ছলছল করতে লাগলো, হঠাৎ পিছন থেকে কেউ একজন কাঁধে হাত দিতেই ইমাদ, নাজিফা ভেবে একমুখ খুশী নিয়ে পিছু তাকাতেই দেখে একটি নয় কি দশ বছরের বাচ্চা৷ রুক্ষ চুল, গায়ের ছেড়া ও নোংরা কাপড় দেখে ইমাদের বুঝতে বাকি রইলো না,,, এটি পথশিশু। ইমাদ সহানুভূতির সাথে মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে---- কিছু বলবে মা?
আঙ্কেল তুমি এভাবে মেঝেতে বসে আছো কেন????
---- ও কিছুনা এমনেই।।।।
---- তোমার বুঝি খুব কষ্ট আমার মতো?
ইমাদ মেয়েটির কথায় একটু অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞাসা করলে--- তোমার কষ্ট কিসের মা?
মেয়েটি খিলখিল করে হেঁসে ---- তুমি জানো না বুঝি যাদের দুনিয়াতে মা- বাবা নেই তাদের কত কষ্ট তাদের কেউ খাবার দেয়না, তারা স্কুলে যেতে পারেনা, আর তারা কেউকে মা কিংবা বাবা বলে ও ডাকতে পারেনা। ইমাদ সাথেসাথেই মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরলো, ওর কপালে চুমু খেয়ে চোখের জল মুছে বললো---- খুব ক্ষুদা লেগেছে বুঝি।
--- হুম।
--- চল আজকে সারাদিন আমি তোমাকে নিয়ে ঘুরবো, খাবো।।।
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে--- সত্যি বলছো?
--- হ্যা তো।।।।
.
.
ইমাদ সারাদিন মেয়েটিকে নিয়ে এই ব্যস্ত শহরের অলিতে- গলিতে ঘুরেছে, , হয়তো মেয়েটিকে একটু আনন্দ দিতে গিয়ে নাজিফার চলে যাওয়ার বিয়োগ বেদনা ভুলে গিয়েছে।। কিন্তু দিনশেষে যখন রাতের আধারে বাড়ি ফেরার দিকে অগ্রসর হতে লাগলো,,,, তখনি বুকের বা পাশে হাহাকার করতে লাগলো।।৷ আচ্ছা আমার কেন কষ্ট হচ্ছে আমি তো এটাই চেয়েছি এটাই তাহলে।।
এই বলে ছেলেটি জোরে- চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলো,,, এই যন্ত্রনা, কান্না আজ থেকে কয়েকবছর আগে, মিতুর চলে যাওয়াতে বুকে বাসা বেধেছিল। আজ আবার নতুন করে।
.
.
ইমাদ বাসায় ফেরতেই সালেহা ওর সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে বললো--- আজকে সারাদিন কোথায় ছিলিস??
ইমাদ কান্নামাখা মুখে--- মা নাজিফা আমায় ছেড়ে চলে গেছে।।।
সালেহা তখন একটু হেসে বললো--- ভালো হয়েছে তো তুই তো তাই চেয়েছিস।।।
ইমাদ মায়ের এমন আচরণ দেখে অবাক হয়ে গেলো, নাবা আর নওরিন বললো--- এতে কান্নার কি আছে।।।
---- মানে কি তোদের মা চলে গেছে,,, এমন আচরণ করছিস কেন তোরা।।
এই বলে ইমাদ রেগে উপরে চলে যায়, সালেহা খিলখিল করে হেসে বলতে লাগলো---- পাগল ছেলে....৷


ইমাদ ঘরে এসে খাটের সামনে বসে রইলো,,, কিছুসময় পর- পর ফুপিয়ে - ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। হঠাৎ ফোনের ক্রিং,ক্রিং আওয়াজ,,, ইমাদ কিছুটা বিরক্তিকর ভাব নিয়ে ফোনটা বিছানার উপর ফেলে দিলো। প্রায় আদাঘন্টা ফোন বেজেই চললো এক প্রকার রাগ নিয়ে ফোন ধরতেই ফোনের ওপাশ থেকে---- এই তুমি ফোন ধরলা না কেন? কি হয়েছে, এতো শোক পালন করার তো কিছুই হয়নি,,, তাড়াতাড়ি ছাদে আস ও তো।।।
ইমাদ কন্ঠ টা শুনেই বুঝে ফেললো এটা নাজিফা,,, হাসতে- হাসতে উপরে চলে গেলো।
বাহিরে হিমহিম বাতাস বইছে,,, ছাদের একপাশে বাসন্তী রং য়ের শাড়ি পড়ে মেয়েটি চিপস হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।।।
ইমাদ কে দেখতে পেয়ে নাজিফা মিটমিট করে হেসে --- কই ছিলা আজকে সারাদিন???
ইমাদ,নাজিফার প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে দৌড়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো, আষ্টেপৃষ্ঠে ওকে আকড়ে ধরলো।
নাজিফা একটু হেসে--- বাবা ইমাদ সাহেব আমায় জড়িয়ে ধরেছে!
--- কেন চলে গেছো তুমি আমায় ছেড়ে?
--- এ মা কই আমি চলে গেছি,,,এইতো আমি।
ইমাদ তখন নাজিফার কপালে চুমু খেয়ে--- আইম স্যরি, প্লিজ আমায় ছেড়ে চলে যেওনা,,, আর তাছাড়া তুমি চলে গেলে কে আমকে নামাজ পড়ার জন্য বকবে, কে আমার বকাগুলো শুনবে।
--- মানে কি তোমার বকা শুনার জন্য আমি তোমার কাছে থাকবো। অবশ্য তোমাকে আর কি বলবো, এই বকাগুলো,এই রাগী ছেলেটাকে মিস করবো বলেই তো টিকেট টাকে অর্ধেক রাস্তায় ছিড়ে ফেলে সোজা বাসায় চলে আসলাম, এসে শুনলাম তুমি নাকি আমায় খুঁজতে গেছো। ব্যস বুঝো তুমি কত কষ্ট আমার হয় যখন তুমি আমায় দূরে ঠেলে দেও তাইতো আমি ও মাকে বললাম তোমাকে যেনো না জানায় আমি বাড়ি ফিরে এসেছি।
ইমাদ নাজিফার হাতটা শক্ত করে ধরে--- আমায় ছেড়ে চলে যাসনা পাগলি।
--- কেন যাবোনা আমি তোমার কে লাগি?
--- তুই আমার বউ লাগিস।
সহসা নাজিফা মৃদু হাসিতে ইমাদের বুকে মাথা রাখলো। এতোদিনে অবশেষে মেয়েটি শান্তির একটা স্থান পেলো, এমন কাউকে পেলো যার বুকে মাথা রেখে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে।
আকাশের সুখতারাগুলোর দিকে চেয়ে ইমাদ মলিন হাসিতে বলে উঠলো--- শুকরীয়া রব, শুকরীয়া,এতো সুন্দর একটা নেয়ামত উপহার দেওয়ার জন্য।
( সমাপ্ত)
লিখা- আসমা আক্তার পিংকি।
( সবাই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন আসলে নিজের পড়াশুনা, ব্যক্তিগত জীবনের কিছু সমস্যার কারনে গল্পটি অফ রেখেছিলাম আর খুব তাড়াতাড়ি নতুন গল্প # প্রিয়তমা নিয়ে আসবো ইনশাআল্লাহ)
#নিয়তি( পর্ব--১৪) লিখা -- আসমা আক্তার পিংকি ।

#নিয়তি( পর্ব--১৪) লিখা -- আসমা আক্তার পিংকি ।

#নিয়তি ( পর্ব--১৪)
লিখা -- আসমা আক্তার পিংকি

ইমাদের ঘরের সামনে এসে নাজিফা কিছুটা সংকোচ নিয়ে বললো---- আসবো?????
ইমাদ তখন মাএ গোসল করে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে।।।।
নাজিফার কন্ঠস্বর ইমাদের কানে যেতেই,, ছেলেটি একটু বিরক্তিকর ভাব নিয়ে বললো------ কি চাও আমার কাছে????
--- মানুষ নিমিষেই বদলে যায়।।। চল্লিশ বছর একসাথে সংসার করে ও স্বামী--- স্ত্রী দুজন-- দুজনকে চিনতে পারলোনা আর আমি কিনা এই কয়েকদিনে ওনার সামান্য ভালো আচরণে ওনাকে চিনে ফেলেছিলাম ভাবলাম।।। আসলে বোকার স্বর্গে বসবাস করা মানুষগুলোর দশা আমার মতোই হয়।
---- হ্যালো আপনাকে বলছি????? কি এই ঘরে কেন আসছেন, আর হাতে ওসব কি??
নাজিফা মুখে মৃদু হাসি নিয়ে---- না মানে আপনার জন্য রাতের ডিনার নিয়ে এসেছি।।।।
ইমাদ গম্ভীর স্বরে,----- Thanks But আমি খাবোনা।। বাহিরে থেকে খেয়ে এসেছি।
---- কেন মিথ্যে কথা বলছেন আপনি???
---- মানে ?????
---- দেখুন আমার সাথে রাগ করেছেন বলে কি খাবেন না এমন কথা কেন বলছেন??
ইমাদ রাগে তেড়ে এসে-- নাজিফার দিকে আঙ্গুল তুলে----- আপনি কে যে আপনার সাথে রাগ করে আমি খাবার খাবোনা,,,, আমার খিদে নেই তাই খাবোনা।
--- তাই বললে হয়।
এই কথা বলে নাজিফা সোজা ইমাদের রুমে ঢুকে যায়, খাবারটা বিছানার পাশে রেখে, একটু হাসি মুখে চেয়ারের মধ্যে রাখা তোয়ালে টা গোছাতে-- গোছাতে ---- নিন ইমাদ সাহেব এবার এই চেয়ারে ভদ্র ছেলেদের মতো বসে খাবারটা খেয়ে নিন।।
ইমাদ তখন টেবিলের উপর রাখা খাবারটাকে হাতে নিয়ে কোনোকিছু না ভেবেই নিচে ফেলে দিলো,,, তারপর জোরে একটা ধমক দিয়ে নাজিফাকে বললো----গেট আউট।।। আজকের পর আপনি আর কখনোই আমার রুমে আসবেননা।।।
.
.
.
নাজিফা ভয়ে-- ভয়ে মেঝে থেকে --- ভাঙ্গা প্লেট, গ্লাস উঠাতে লাগলো ।।।। ইমাদের দিকে চেয়ে করুন স্বরে বললো---- আজকে সারাদিন কিছুই খায়নি,,,৷ ভেবেছিলাম আপনি আসলে অতঃপর খাবো। কিন্তু তাও হলোনা,,,,,,,,,,
কথাগুলো শুনে ইমাদের খুব মায়া হলো নাজিফার উপর কিন্তু নিজের ইগোটা বজায় রেখে চওড়া গলায় নাজিফাকে বললো--- কে বলেছে এতো ন্যাকামি করতে,,,, আমি কি বলেছি আমার জন্য না খেয়ে পাগলামি করতে, যতসব, , গিয়ে খেয়ে নিন যান।।।
------ না খাবোনা দেখি আপনি ও কতক্ষন আপনার জেদটা বজায় রাখতে পারেন আর আমি ও কতক্ষন পারি।।।।
এই বলে নাজিফা বেখেয়ালে মেঝেতে পড়ে থাকা কাঁচের টুকরোতে হাত দিতেই হাতটা চরমভাবে কেটে যায়। ইমাদ তা দেখে এক কদম সামনে আসলে ও পরে নিষ্ঠুর মানুষের মতো পিছিয়ে যায়।।।
নাজিফা তা দেখে আর ও বেশি কষ্ট পেলো। ইমাদকে কোনোকিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।।।
.
.
.
নাজিফা চলে যেতেই ইমাদের কেন যেনো ভীষণ কষ্ট অনুভব হতে লাগলো।।। শুধু মেঝের দিকে তাকিয়ে নাজিফার রক্তগুলোর পানে চেয়েই রইলো।।
--- না এতোটা খারাপ আচরণ ও করা উচিত হয়নি আমার।।
.
.
রাত যখন দেড়টা বাজে ইমাদ চুপিচুপি মায়ের রুমে যায়,, গিয়ে দেখে নাজিফা সেখানে নেই।
কিছুটা বিস্মিত হয়ে,,,,,----- কি ব্যাপার ও কোথায় শুয়েছে???? নওরীন আর নাবার রুমে নয়তো।
ইমাদ দ্রুত নওরীন আর নাবার রুমে গিয়ে দেখে সেখানে ও নাজিফা নেই।
৷ -----এখানে ও নেই, তাহলে কোথায় ও????
ইমাদ একটু চিন্তায় পড়ে যায়,,,, --- আচ্ছা ও আবার বাড়ি থেকে চলে যায় নি তো?
গেলে তো ভালো তাতে আ,আ,আমার কি,,, কিন্তু নাবা তো ওকে অনেক ভালোবাসে,,,,, না,না, যায়নি হয়তো অন্য কোথাও আছে।
ইমাদ গেস্ট রুমে গিয়ে দেখে মেয়েটি সেখানে ,,, ইমাদ নাজিফার পাশে গিয়ে বসে মেয়েটির দিকে চেয়ে রইলো।।। হঠাৎ করে ইমাদের চোখ পড়লো মেয়েটির হাতের উপর,,,, হাতটা সত্যিই খুব বাজে ভাবে কেটে গেছে, ,,, হাত দিয়ে প্রচন্ড রক্ত পড়েছিলো যার প্রতিটি ফোঁটা মেঝেতে পড়ে রয়েছে।। কিন্তু শুকিয়ে গেছে রক্ত গুলো কিন্ত দাগটা এখনো ও শুকায় নি।।।।।।
৷ ইমাদ নাজিফার কান্ড দেখে ইমোশানাল হয়ে যায়,,,,,! ------ আজিব মেয়ে তো এ,,, মানুষ তো হাত কাটা গেলে সাথে-- সাথে ব্যান্ডেজ করে আর না হয় রক্ত পড়া বন্ধ করে,,, আর এ,,,,,,
এই বলে ইমাদ জোরে--- জোরে নাজিফাকে ডাকতে লাগলো-----এই মেয়ে,,, এই ।
নাজিফার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ইমাদ ওর কপালে হাত দিয়ে আবার ডাকতে লাগলো।।
অমনেই নাজিফার ঘুম ভেঙে ইমাদের দিকে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে যায়।
----- আপনি এখানে,,,,,
----- হ্যা এসেছি তোমার কোনো সমস্যা আছে?
----- না মানে আপনি এতো রাতে এই ঘরে।।
ইমাদ রেগে-- এটা আমার বাড়ি অতএব আমি যখন -- তখন যে কোনো ঘরে যেতে পারবো ওকে।।।। এনিওয়ে এই রক্ত দিয়ে আমাদের ঘরের মেঝেটা এতো নোংরা করেছো কেন????
নাজিফা মাথা নিচু করে ---- স্যরি, আসলে,,,,,,,
--- থাক - থাক আর এতো কৈফিয়ত দেওয়া লাগবেনা।
ইমাদ ডয়ার থেকে ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে নাজিফার হাতটা ড্রেসিং করে দিলো।।।।
নাজিফা ইমাদের দিকে মিটিমিটি হাসতে লাগলো।।
---- হে ইউ এতো হাসার কি হলো????
---- না মানে এতো উপরে-- উপরে রাগ দেখিয়ে কি লাভ বলুন যদি ভিতরের হৃদয় টা এতো নরম হয়।।।।
---- চুপ থাকুন মানবতার ক্ষাতিরে এইটুকু করেছি বলে আপনি আবার আমার হৃদয় নিয়ে গবেষণা করছেন এখন?
এই বলে ইমাদ চলে যেতে চাইলে নাজিফা ভারী কন্ঠে বললো----- এখনো ও কিছু খায়নি,,,,,,,,,,
ইমাদ ওর দিকে তাকিয়ে মনে--- মনে বললো---- এই মেয়েটি এতো মায়া লাগায় কেন???? এতো কিছু আমি ওকে বলি কিন্তু আমার প্রতি ওর বিন্দুমাত্র রাগ নেই, অভিমান নেই।।।।।।
------ কি হলো আপনি এখন ও কি খাবেন না? ওকে ফাইন খাওয়া লাগবেনা আমি ঘুমাই।।।।।
----- আচ্ছা আমার খাবারের সাথে আপনার সম্পর্ক কি????
---- ওটা বুঝার ক্ষমতা আল্লাহ আপনাকে দিছে। যেদিন চলে যাবো সেদিন বুঝবেন।
নাজিফার এই কথায় ইমাদের কেন যেনো খুব রাগ হলো ----- এই আপনার সমস্যা কি,,, এতো পরিমান ফালতু কথা আপনি বলতে পারেন।।। আর কোনোদিন যেনো এসব কথা আমি না শুনি।।। এনিওয়ে আপনি ওয়েট করুন আমি খাবার নিয়ে আসছি।
---- খাবার আনা লাগবে না,,,,,
---- মানে???
নাজিফা হাত দিয়ে টেবিলের দিকে ইশারা করে---- ঐ যে খাবার রাখা আছে।
---- তার মানে খাবার এনে আপনি রেখে দিয়েছেন অথচ খাননি।
---- খায়নি কারন আমি জানতাম আপনি আসবেন আর তাই আপনার জন্য ওয়েট করতে- করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি নিজেই বুঝতে পারিনি।
.................
ছেলেটি যতো নাজিফাকে দেখছে ততই অবাক হচ্ছে আল্লাহ পাক যে ওকে কি পরিমান ধৈর্য আর কোমলতা দিয়ে সৃষ্টি করেছে তা সত্যিই প্রশংসানীয় যোগ্য। এমন মানুষের জন্য সত্যি মনের মাঝে আলাদা একটা সম্মান ও মায়া জন্মে।
..
..
ইমাদ টেবিলের উপর থেকে খাবারটা নিয়ে নাজিফার কাছে গিয়ে বসে, কিছুসময় চুপ থেকে ভাতগুলো মাখতে--- মাখতে নাজিফাকে জিজ্ঞাসা করলো------ মোহনের সাথে ও কি এমন করতেন???
মোহন নামটা শুনতেই মেয়েটির চেহারাটা মলিন হয়ে যায়,,,৷ অতীতের ডায়রীটা মেয়েটি একদম খুলতে চায়না, কিন্তু তার বর্তমান যে তাকে সবসময় অতীতের ডায়রীটাই খুলতে বাধ্য করায়।
---- কি হলো কথা বলছেন না কেন????
----- আসলে ওই মানুষটার উপর আমি কখনোই অধিকার খাটায় নি।।।
--- কেন?
--- কারন ওকে কখনোই আমি ভালোবাসতে পারি নি।
----- তাহলে আমার উপর কেন অধিকার দেখাচ্ছেন??
---- এইটুকু বুঝেন না,,,,, নাকি না বুঝার অভিনয় করছেন???
ইমাদ আর কোনো কথাই বললো না, নিশ্চুপ হয়ে গেলো কেননা নাজিফার প্রশ্নের উওরটা ছেলেটার কাছে নেই।।।
-নাজিফার মুখের সামনে খাবার নিয়ে--- নিন খেয়ে নিন।
---- আজ তো আমি আপনার কাছে খায়িয়ে দেওয়ার আবদার করিনি তাহলে নিজে থেকে কেন খায়িয়ে দিচ্ছেন?
ইমাদ আমতা- আমতা করে--- জানীনা।।
---- জানার চেষ্টা করবেন, তাহলে অনেক কিছুর উওর ও পেয়ে যাবেন।
( চলবে)
লিখা -- আসমা আক্তার পিংকি।
( সামনে পরীক্ষা তাই দিতে লেট হচ্ছে দুঃখিত)
#নিয়তি( পর্ব--১৩)  লিখা--আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি( পর্ব--১৩) লিখা--আসমা আক্তার পিংকি

#নিয়তি( পর্ব--১৩)
লিখা--আসমা আক্তার পিংকি


ইদানিং ইমাদের মনটা সারাদিন খুব খারাপ থাকে, সারাদিন কিছু অজুহাত খোঁজে নাজিফার সাথে কথা বলতে। কিন্তু নাজিফা সহজে ইমাদের কাছে ও আসেনা। আজ সকাল -- সকাল ইমাদের ঘুম ভাঙতেই সে দেখে নাজিফা তার পাশে নেই। বিস্মিত কন্ঠে নাজিফাকে ইমাদ ডাকতে লাগলো কিন্ত কোনো সাড়াশব্দ নেই।
----- কি ব্যাপার আমি এতো ডাকছি, তা ও আসছে না!!!!!
ইমাদ বিছানা থেকে নেমে, সোজা নিচে চলে গেলো। গিয়ে দেখে নাজিফা রান্না ঘরে রুটি বানাচ্ছে, পাশে নওরীন বসে রয়েছে আর নাজিফার সাথে কিছুসময় পর -- পর কথা বলছে ----- আচ্ছা মামুনি তুমি কালকে রাতে আমাদের সাথে শুয়েছো কেন?????
---- কি করবো বলো মা,তোমার বাবাই যে ঘুৃেম প্রচন্ড নাক ডাকে।
কথাটি ইমাদের কানে যেতেই আচমকা কন্ঠে নাজিফার দিকে চেয়ে বললো ---Excuse me,,,,,,,,, আমি নাক ডাকি!!!!!!!!!!
নাজিফা একটু হেসে------ তো কি আমি মিথ্যে বলছি?????
---- হ্যা বাবাই তুমি নাক ডাকো......
ইমাদ গরম চোখে নওরীনের দিকে তাকিয়ে------ ফাজলামো হচ্ছে আমার সাথে, তুই কখনো শুনেছিস আমার নাক ডাকার অভ্যাস আছে????
--- না তবে এখন তো মামুনির কাছে শুনেছি।।।।
এই বলে নওরীন আর নাজিফা খিলখিল করে হাসতে লাগলো, ওদের হাসির আওয়াজে উপর থেকে ফাহাদ তিক্ত কন্ঠে বলে উঠলো ---- বাহ!!!! নওরীন ভালোই তো সহজে মানুষকে ভুলে যেতে পারিস।।।
নওরীন হাসি মুখটাকে ফ্যাকাসে করে--- মানে বড় আব্বু!!
ফাহাদ একটু অট্টহাসি দিয়ে----- মাকে এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি!!!! মায়ের জায়গায় খুব সহজে এই মেয়েটিকে স্থান দিলি!!!
ফাহাদের পাশে ফাহমিদা দাড়িয়ে নেইলকাটার দিয়ে নখ কাটতে -- কাটতে,,,,, ------ ভুলবেনা,,,, ফাহাদ তোমার ভাইয়ে ও তো মিতুকে খুব সহজে ভুলে গেলো। এই সেই ইমাদ যে মিতুকে ছাড়া কিছুই বুঝতোনা, মিতুর মৃত্যুর পর ইভেন ওয়াদা ও করেছিলো আর কোনোদিন বিয়ে করবে না, আর আজ সে ছেলেই নাকি এভাবে পাল্টে গেলো।।।।।
.
.
.
ইমাদ ফাহমিদার কথাগুলোতে নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করলো--- সত্যিই তো আমি এতো তাড়াতাড়ি মিতুকে ভুলে গেলাম!! আমি যে মিতুকেই শুধু ভালোবাসি তাহলে কেন নাজিফার জন্য আমার এতো কাকুতি-- মিনতি। কেন নাজিফাকে আমি এতো গুরুত্ব দিচ্ছি???? আমি তো তাহলে মিতুকে ঠকাচ্ছি, ,,,, আমার ভালোবাসাকে ছোট করে ফেলছি???
ফাহমিদা নিচে নেমে এসে ইমাদের সামনে দাঁড়িয়ে----- আচ্ছা ইমাদ তুৃমি কি সত্যি মিতুকে কখনো লাভ করেছো????
ইমাদ আমতাআমতা করে--- কে কে কেন তোমার এটা মনে হচ্ছে বৌ মনি????
---- না আসলে তোমার ভালোবাসাটা এতোটাই পানসে যে মানুষটা মরে যাওয়ার সাথে -- সাথে তুমি তাকে ভুলে গেলে?? তার জায়গায় অন্য কাউকে স্থান দিলে?? আদৌ কি এটাকে কি রিয়েল লাভ বলে নাকি ফেইক বলে??? তুমিয়ে ভাবো --- যাকে ছাড়া একটা সময় তুৃমি কিছু বুঝতে না আজ তাকেই তোমার সারাদিন একবার ও মনে পড়ে না।।।।। যার ছবি দেখলে একটা সময় তার বিয়োগ বেদনায় কাঁদতে,,,, আজ তার জন্যই দু'ফোঁটা চোখের জল ও ভুল করে ঝরে পড়ে না।।।।
ব্যাপারটা তোমাকে এখন আর ভাবায় না তাইনা, আসলে তুমি কখনোই মিতুকে ভালোবাসোনি...............
ইমাদ ফাহমিদার দিকে তাকিয়ে কান্নামাখা কন্ঠে ----- ঠিকেই তো আমি এমন ভুল কিভাবে করলাম,,, আমি কেমনে ওকে ভুলে আছি.....
এই বলতে -- বলতে ইমাদ ঘর থেকে বের হয়ে যায়। নাজিফা কাঁদতে-- কাঁদতে ইমাদের পিছু যেতে চাইলেই ফাহমিদা নাজিফার হাতটা শক্ত করে ধরে--- আমাকে সেদিন জ্ঞান দিয়েছিলে না এবার বুঝো আমি কি, কি করতে পারি।।।। দেখো আজকে সারাদিন ও ইমাদ বাসায় আসে কিনা।।
.
.
.
এই বলে ফাহমিদা ফিকফিক হেঁসে ফাহাদকে বললো---- চলো ফাহাদ রুমে যাই এখনো বুয়ার যে রুটি বানানো হয়নি,,,,,,,
যাওয়ার সময় নওরীন কে উদ্দেশ্যে করে ফাহমিদা বললো-- আর হ্যা নওরীন তুই যে একে মামুনি বলে ডাকিস তুই জানীস এতে তোর মা কতোটা কষ্ট পাচ্ছে কবরে।।।। তুই ও তোর মাকে ভুলে গেলি।
ফাহমিদার কথায় নওরীনের মনটা ঘুরে গেলো। নওরীন ও ঘরের দিকে চলে গেলো। সবাই যখন নাজিফাকে একা করে চলে গেলো,, মেয়েটি তখন নিচে বসে পড়লো ---- উপরে দিকে তাকিয়ে কাঁদতে -- কাঁদতে সৃষ্টিকর্তাকে বললো--- আর কতো আমার পরীক্ষা নিবা তুমি??? আল্লাহ বলতে পারো কেন আমার সাথে এমন হচ্ছে, শুধুমাত্র তোমাকে ভালোবসি বলে আমি মোহনের কাছে এতো অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছি,লোকমুখে এতো কথা শুনেছি। তোমাকে সবসময় বলেছি --- আল্লাহ জীবনে এমন একজন মানুষের সাথে দেখা করাও যে আমাকে সম্মান করবে, ভালোবাসবে, যে একজন ভালো মানুষ হবে।। অবশেষে তুমি দেখা করালে এমন একটা মানুষের সাথে আশার আলো জাগালে মনে এখন আবার তুমিয়ে তা নিভিয়ে দিতে চাচ্ছো,,, আমি কি করবো বলো,,,, আমি কি করবো।।।।
.
.
.
মেয়েটি বুকের চাপা কষ্ট গুলো আজ আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক তো হলো সেগুলো চেপে রেখে কষ্ট পাওয়া,,,, ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি রেখে এক জীবন এভাবে পার করা। কিন্তু দিনশেষে যখন সূর্য টা অস্তমিত হয় তখন সত্যিই ভাবতে হয় মেয়েটি -- জীবনে কারো ভালোবাসা পেলোনা , না বাবার, না মায়ের, না স্বামীর, আর না এই পৃথিবীর কারো। কিন্তু তবুও মেয়েটি ঠকে গিয়ে নিজেকে জিতিয়ে দেয় এই ভেবে যে কারো না পেলে ও যে মহান আল্লাহ পাকের ভালোবাসা পেয়েছি ওটাই আমার জন্য যথেষ্ট।।
কিন্তু আজ আর পারলোনা মনকে বুঝাতে। কেননা মেয়েটি যে ইমাদকে প্রচন্ড ভালোবেসে ফেলেছে। নিজের মনের সবটুকু রং দিয়ে যে সে ইমাদকে নিজের করে নিয়েছে ।।।
সালেহা বেগম নাজিফার গুনগুনিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনে তাড়াতাড়ি করে বাহিরে এসে দেখে-- নাজিফা মেঝেতে বসে কাঁদছে। চোখের জলগুলো অনায়াসে গড়িয়ে পড়ছে।।।
সালেহা একটু চমকে গিয়ে--- নাজিফা মা তোর কি হয়েছে???? তুই কেন এভাবে কাঁদছিস???
মায়ের মতো শাশুড়ির এমন কাকুতি কন্ঠ নাজিফার কানে যেতেই নাজিফা এক লাফ মেরে উঠে পড়লো। সালেহাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো--- মা ইমাদ, ইমাদ.....
--- হ্যা কি হয়েছে বল?
--- মা ইমাদ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে।।
--- কিন্তু কেন???
নাজিফা তখন সবকিছু খুলে বলতেই সালেহা ক্ষীণ কন্ঠে বললো---- এরা আমার ছেলেটাকে ভালোভাবে বাঁচতে দিবেনা।
নাজিফা কাঁপা - কাঁপা কন্ঠে--- মা প্লিজ তুমি এভাবে বলোনা। তুমি বরং ওকে একবার ফোন দিয়ে বলো--- বাসায় ফিরে আসতে,,, তুৃমি তো মা তোমার কথা শুনবে হয়তো.........
সালেহা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে --- না রে মা..... ও আজ সারাদিন ও বাড়ি ফিরবেনা।।।
---- মা তুমি একবার চেষ্টা করোনা.....৷
--- তুই যেহুতে বলছিস তাহলে আমি ফোন দেই...
এই বলে সালেহা বেগম ফোন দিলো। ফোনের ওপাশে রিং হলো,,,, কিন্তু ফোন ধরার মানুষটা হয়তো ইচ্ছে করেই ফোন ধরলো না।
সালেহা নিরাশ হয়ে--- ফোন ধরছে না।।।। নাজিফা চুপ হয়ে সালেহার দিকে চেয়ে রইলো।।।।
.
.
.
সন্ধের দিকে ইমাদ বাড়ি ফিরতেই সালেহা ওর সামনে গিয়ে,,, কিছুটা রেগে বললো--- সারাদিন কোথায় ছিলিস???আমি এতোবার তোকে ফোন করলাম তুই কেন ফোন ধরলি না।।।
ইমাদ গম্ভীর কন্ঠে --- ইচ্ছে করেনি তাই ধরিনি মা। আর তাছাড়া আমি আগে ও তো এমন ছিলাম, হঠাৎ বাড়ি থেকে চলে যেতাম,,, তুমি ফোন দিতে যখন দেখতে আমি ধরতাম না তখন বুঝে নিতে আমি মিতুর কবর যিয়ারত করতে গিয়েছি তাহলে আজ কেনো এতো চিন্তা, প্রশ্ন???
-
--- কারন সেদিন মিতু ছাড়া তোর জীবনে কেউ ছিলোনা,কিন্তু আজ নাজিফা তোর জীবনে এসেছে। মিতু আজ তোর অতীত এবং নাজিফা তোর বর্তমান, ভবিষ্যৎ।।।
ইমাদ চেঁচিয়ে -- চেঁচিয়ে সালেহাকে বললো----ব্যস মা তুমি অনেক করেছো, কিন্তু আর নয়। তোমার কারনে আমি মিতুকে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছি। মা একটা কথা নাজিফাকে মাথায় ঢুকিয়ে নিতে বলো--আমি কখনোই ওকে স্ত্রীর অধিকার দিতে পারবোনা। আর কখনোই ভালোবাসতে পারবো না।
এই বলে ইমাদ উপরে যেতেই নাজিফা ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। কাজল লেপটানো চোখ দুটো আশ্রুজলে ইমাদের দিকে চেয়ে আস্তে - করে বললো--- যদি কখনোই স্ত্রীর মর্যাদা নাই দিতে পারেন তাহলে কেন মায়ের সাথে চলে যেতে দিলেন না??? কেন এভাবে আমাকে মায়ার জালে আটকে দিলেন? কেন এতো মায়া দেখালেন???
.
.
.
নাজিফার প্রশ্নের উওর ইমাদ দিতে পারলো না। কেননা সে নিজেই জানেনা কোন মায়াজালে সে আটকে পড়েছে।।।।
কিছুটা রাগী ভাব নিয়ে চোখ লাল চে করে নাজিফাকে বললো--- জানীনা।।।।।
এই বলে উপরের দিকে নিজের ঘরে চলে গেলো।।। নাজিফা ইমাদের চলে যাওয়ার দিকে অনিমেষ ভাবে চেয়ে রইলো।।
.
.
.
রান্নাঘরে এসে নাজিফা নিজেকেই নিজে বলতে লাগলো ---
ইমাদের সাহেবের মনটা হয়তো তখন খুব খারাপ ছিলো তাই এইভাবে আচরণ করেছে। এখন হয়তো মন- মানসিকতা আবার ঠিক হয়ে গেছে,,,,,,,,, এখন আমার সাথে ভালোভাবেই কথা বলবে এই ভেবে নাজিফা সমস্ত কষ্ট দূরে সরিয়ে,,,,, ইমাদের জন্য রাতের খাবার নিয়ে উপরে গেলো।।।
(চলবে)
লিখা--আসমা আক্তার পিংকি।।।।
ইদানিং ইমাদের মনটা সারাদিন খুব খারাপ থাকে, সারাদিন কিছু অজুহাত খোঁজে নাজিফার সাথে কথা বলতে। কিন্তু নাজিফা সহজে ইমাদের কাছে ও আসেনা। আজ সকাল -- সকাল ইমাদের ঘুম ভাঙতেই সে দেখে নাজিফা তার পাশে নেই। বিস্মিত কন্ঠে নাজিফাকে ইমাদ ডাকতে লাগলো কিন্ত কোনো সাড়াশব্দ নেই।
----- কি ব্যাপার আমি এতো ডাকছি, তা ও আসছে না!!!!!
ইমাদ বিছানা থেকে নেমে, সোজা নিচে চলে গেলো। গিয়ে দেখে নাজিফা রান্না ঘরে রুটি বানাচ্ছে, পাশে নওরীন বসে রয়েছে আর নাজিফার সাথে কিছুসময় পর -- পর কথা বলছে ----- আচ্ছা মামুনি তুমি কালকে রাতে আমাদের সাথে শুয়েছো কেন?????
---- কি করবো বলো মা,তোমার বাবাই যে ঘুৃেম প্রচন্ড নাক ডাকে।
কথাটি ইমাদের কানে যেতেই আচমকা কন্ঠে নাজিফার দিকে চেয়ে বললো ---Excuse me,,,,,,,,, আমি নাক ডাকি!!!!!!!!!!
নাজিফা একটু হেসে------ তো কি আমি মিথ্যে বলছি?????
---- হ্যা বাবাই তুমি নাক ডাকো......
ইমাদ গরম চোখে নওরীনের দিকে তাকিয়ে------ ফাজলামো হচ্ছে আমার সাথে, তুই কখনো শুনেছিস আমার নাক ডাকার অভ্যাস আছে????
--- না তবে এখন তো মামুনির কাছে শুনেছি।।।।
এই বলে নওরীন আর নাজিফা খিলখিল করে হাসতে লাগলো, ওদের হাসির আওয়াজে উপর থেকে ফাহাদ তিক্ত কন্ঠে বলে উঠলো ---- বাহ!!!! নওরীন ভালোই তো সহজে মানুষকে ভুলে যেতে পারিস।।।
নওরীন হাসি মুখটাকে ফ্যাকাসে করে--- মানে বড় আব্বু!!
ফাহাদ একটু অট্টহাসি দিয়ে----- মাকে এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি!!!! মায়ের জায়গায় খুব সহজে এই মেয়েটিকে স্থান দিলি!!!
ফাহাদের পাশে ফাহমিদা দাড়িয়ে নেইলকাটার দিয়ে নখ কাটতে -- কাটতে,,,,, ------ ভুলবেনা,,,, ফাহাদ তোমার ভাইয়ে ও তো মিতুকে খুব সহজে ভুলে গেলো। এই সেই ইমাদ যে মিতুকে ছাড়া কিছুই বুঝতোনা, মিতুর মৃত্যুর পর ইভেন ওয়াদা ও করেছিলো আর কোনোদিন বিয়ে করবে না, আর আজ সে ছেলেই নাকি এভাবে পাল্টে গেলো।।।।।
.
.
.
ইমাদ ফাহমিদার কথাগুলোতে নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করলো--- সত্যিই তো আমি এতো তাড়াতাড়ি মিতুকে ভুলে গেলাম!! আমি যে মিতুকেই শুধু ভালোবাসি তাহলে কেন নাজিফার জন্য আমার এতো কাকুতি-- মিনতি। কেন নাজিফাকে আমি এতো গুরুত্ব দিচ্ছি???? আমি তো তাহলে মিতুকে ঠকাচ্ছি, ,,,, আমার ভালোবাসাকে ছোট করে ফেলছি???
ফাহমিদা নিচে নেমে এসে ইমাদের সামনে দাঁড়িয়ে----- আচ্ছা ইমাদ তুৃমি কি সত্যি মিতুকে কখনো লাভ করেছো????
ইমাদ আমতাআমতা করে--- কে কে কেন তোমার এটা মনে হচ্ছে বৌ মনি????
---- না আসলে তোমার ভালোবাসাটা এতোটাই পানসে যে মানুষটা মরে যাওয়ার সাথে -- সাথে তুমি তাকে ভুলে গেলে?? তার জায়গায় অন্য কাউকে স্থান দিলে?? আদৌ কি এটাকে কি রিয়েল লাভ বলে নাকি ফেইক বলে??? তুমিয়ে ভাবো --- যাকে ছাড়া একটা সময় তুৃমি কিছু বুঝতে না আজ তাকেই তোমার সারাদিন একবার ও মনে পড়ে না।।।।। যার ছবি দেখলে একটা সময় তার বিয়োগ বেদনায় কাঁদতে,,,, আজ তার জন্যই দু'ফোঁটা চোখের জল ও ভুল করে ঝরে পড়ে না।।।।
ব্যাপারটা তোমাকে এখন আর ভাবায় না তাইনা, আসলে তুমি কখনোই মিতুকে ভালোবাসোনি...............
ইমাদ ফাহমিদার দিকে তাকিয়ে কান্নামাখা কন্ঠে ----- ঠিকেই তো আমি এমন ভুল কিভাবে করলাম,,, আমি কেমনে ওকে ভুলে আছি.....
এই বলতে -- বলতে ইমাদ ঘর থেকে বের হয়ে যায়। নাজিফা কাঁদতে-- কাঁদতে ইমাদের পিছু যেতে চাইলেই ফাহমিদা নাজিফার হাতটা শক্ত করে ধরে--- আমাকে সেদিন জ্ঞান দিয়েছিলে না এবার বুঝো আমি কি, কি করতে পারি।।।। দেখো আজকে সারাদিন ও ইমাদ বাসায় আসে কিনা।।
.
.
.
এই বলে ফাহমিদা ফিকফিক হেঁসে ফাহাদকে বললো---- চলো ফাহাদ রুমে যাই এখনো বুয়ার যে রুটি বানানো হয়নি,,,,,,,
যাওয়ার সময় নওরীন কে উদ্দেশ্যে করে ফাহমিদা বললো-- আর হ্যা নওরীন তুই যে একে মামুনি বলে ডাকিস তুই জানীস এতে তোর মা কতোটা কষ্ট পাচ্ছে কবরে।।।। তুই ও তোর মাকে ভুলে গেলি।
ফাহমিদার কথায় নওরীনের মনটা ঘুরে গেলো। নওরীন ও ঘরের দিকে চলে গেলো। সবাই যখন নাজিফাকে একা করে চলে গেলো,, মেয়েটি তখন নিচে বসে পড়লো ---- উপরে দিকে তাকিয়ে কাঁদতে -- কাঁদতে সৃষ্টিকর্তাকে বললো--- আর কতো আমার পরীক্ষা নিবা তুমি??? আল্লাহ বলতে পারো কেন আমার সাথে এমন হচ্ছে, শুধুমাত্র তোমাকে ভালোবসি বলে আমি মোহনের কাছে এতো অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছি,লোকমুখে এতো কথা শুনেছি। তোমাকে সবসময় বলেছি --- আল্লাহ জীবনে এমন একজন মানুষের সাথে দেখা করাও যে আমাকে সম্মান করবে, ভালোবাসবে, যে একজন ভালো মানুষ হবে।। অবশেষে তুমি দেখা করালে এমন একটা মানুষের সাথে আশার আলো জাগালে মনে এখন আবার তুমিয়ে তা নিভিয়ে দিতে চাচ্ছো,,, আমি কি করবো বলো,,,, আমি কি করবো।।।।
.
.
.
মেয়েটি বুকের চাপা কষ্ট গুলো আজ আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক তো হলো সেগুলো চেপে রেখে কষ্ট পাওয়া,,,, ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি রেখে এক জীবন এভাবে পার করা। কিন্তু দিনশেষে যখন সূর্য টা অস্তমিত হয় তখন সত্যিই ভাবতে হয় মেয়েটি -- জীবনে কারো ভালোবাসা পেলোনা , না বাবার, না মায়ের, না স্বামীর, আর না এই পৃথিবীর কারো। কিন্তু তবুও মেয়েটি ঠকে গিয়ে নিজেকে জিতিয়ে দেয় এই ভেবে যে কারো না পেলে ও যে মহান আল্লাহ পাকের ভালোবাসা পেয়েছি ওটাই আমার জন্য যথেষ্ট।।
কিন্তু আজ আর পারলোনা মনকে বুঝাতে। কেননা মেয়েটি যে ইমাদকে প্রচন্ড ভালোবেসে ফেলেছে। নিজের মনের সবটুকু রং দিয়ে যে সে ইমাদকে নিজের করে নিয়েছে ।।।
সালেহা বেগম নাজিফার গুনগুনিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনে তাড়াতাড়ি করে বাহিরে এসে দেখে-- নাজিফা মেঝেতে বসে কাঁদছে। চোখের জলগুলো অনায়াসে গড়িয়ে পড়ছে।।।
সালেহা একটু চমকে গিয়ে--- নাজিফা মা তোর কি হয়েছে???? তুই কেন এভাবে কাঁদছিস???
মায়ের মতো শাশুড়ির এমন কাকুতি কন্ঠ নাজিফার কানে যেতেই নাজিফা এক লাফ মেরে উঠে পড়লো। সালেহাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো--- মা ইমাদ, ইমাদ.....
--- হ্যা কি হয়েছে বল?
--- মা ইমাদ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে।।
--- কিন্তু কেন???
নাজিফা তখন সবকিছু খুলে বলতেই সালেহা ক্ষীণ কন্ঠে বললো---- এরা আমার ছেলেটাকে ভালোভাবে বাঁচতে দিবেনা।
নাজিফা কাঁপা - কাঁপা কন্ঠে--- মা প্লিজ তুমি এভাবে বলোনা। তুমি বরং ওকে একবার ফোন দিয়ে বলো--- বাসায় ফিরে আসতে,,, তুৃমি তো মা তোমার কথা শুনবে হয়তো.........
সালেহা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে --- না রে মা..... ও আজ সারাদিন ও বাড়ি ফিরবেনা।।।
---- মা তুমি একবার চেষ্টা করোনা.....৷
--- তুই যেহুতে বলছিস তাহলে আমি ফোন দেই...
এই বলে সালেহা বেগম ফোন দিলো। ফোনের ওপাশে রিং হলো,,,, কিন্তু ফোন ধরার মানুষটা হয়তো ইচ্ছে করেই ফোন ধরলো না।
সালেহা নিরাশ হয়ে--- ফোন ধরছে না।।।। নাজিফা চুপ হয়ে সালেহার দিকে চেয়ে রইলো।।।।
.
.
.
সন্ধের দিকে ইমাদ বাড়ি ফিরতেই সালেহা ওর সামনে গিয়ে,,, কিছুটা রেগে বললো--- সারাদিন কোথায় ছিলিস???আমি এতোবার তোকে ফোন করলাম তুই কেন ফোন ধরলি না।।।
ইমাদ গম্ভীর কন্ঠে --- ইচ্ছে করেনি তাই ধরিনি মা। আর তাছাড়া আমি আগে ও তো এমন ছিলাম, হঠাৎ বাড়ি থেকে চলে যেতাম,,, তুমি ফোন দিতে যখন দেখতে আমি ধরতাম না তখন বুঝে নিতে আমি মিতুর কবর যিয়ারত করতে গিয়েছি তাহলে আজ কেনো এতো চিন্তা, প্রশ্ন???
-
--- কারন সেদিন মিতু ছাড়া তোর জীবনে কেউ ছিলোনা,কিন্তু আজ নাজিফা তোর জীবনে এসেছে। মিতু আজ তোর অতীত এবং নাজিফা তোর বর্তমান, ভবিষ্যৎ।।।
ইমাদ চেঁচিয়ে -- চেঁচিয়ে সালেহাকে বললো----ব্যস মা তুমি অনেক করেছো, কিন্তু আর নয়। তোমার কারনে আমি মিতুকে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছি। মা একটা কথা নাজিফাকে মাথায় ঢুকিয়ে নিতে বলো--আমি কখনোই ওকে স্ত্রীর অধিকার দিতে পারবোনা। আর কখনোই ভালোবাসতে পারবো না।
এই বলে ইমাদ উপরে যেতেই নাজিফা ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। কাজল লেপটানো চোখ দুটো আশ্রুজলে ইমাদের দিকে চেয়ে আস্তে - করে বললো--- যদি কখনোই স্ত্রীর মর্যাদা নাই দিতে পারেন তাহলে কেন মায়ের সাথে চলে যেতে দিলেন না??? কেন এভাবে আমাকে মায়ার জালে আটকে দিলেন? কেন এতো মায়া দেখালেন???
.
.
.
নাজিফার প্রশ্নের উওর ইমাদ দিতে পারলো না। কেননা সে নিজেই জানেনা কোন মায়াজালে সে আটকে পড়েছে।।।।
কিছুটা রাগী ভাব নিয়ে চোখ লাল চে করে নাজিফাকে বললো--- জানীনা।।।।।
এই বলে উপরের দিকে নিজের ঘরে চলে গেলো।।। নাজিফা ইমাদের চলে যাওয়ার দিকে অনিমেষ ভাবে চেয়ে রইলো।।
.
.
.
রান্নাঘরে এসে নাজিফা নিজেকেই নিজে বলতে লাগলো ---
ইমাদের সাহেবের মনটা হয়তো তখন খুব খারাপ ছিলো তাই এইভাবে আচরণ করেছে। এখন হয়তো মন- মানসিকতা আবার ঠিক হয়ে গেছে,,,,,,,,, এখন আমার সাথে ভালোভাবেই কথা বলবে এই ভেবে নাজিফা সমস্ত কষ্ট দূরে সরিয়ে,,,,, ইমাদের জন্য রাতের খাবার নিয়ে উপরে গেলো।।।
(চলবে)
লিখা--আসমা আক্তার পিংকি।।।।